ইইউর যুগান্তকারী ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের অধীনে দুই বছরের তদন্তের পর ইউরোপীয় কমিশন এই প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করেছে। এই আইন অনুযায়ী, বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে অবৈধ ও ক্ষতিকর কন্টেন্ট মোকাবিলায় আরও কঠোর হতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান নজরদারির মুখোমুখি হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তৈরিতে ভূমিকা রাখছে বলে উদ্বেগ রয়েছে। এর ফলে কয়েকটি সরকার অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে অথবা সেই বিষয়ে ভাবছে।
ইইউর প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থা কমিশন জানিয়েছে, উচ্চ ব্যক্তিগতকৃত সুপারিশ, অটোপ্লে এবং ইনফিনিট স্ক্রল ব্যবহারকারীদের মধ্যে যে আসক্তির ঝুঁকি তৈরি করে, তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে মেটা। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যবহারকারীদের ক্রমাগত নতুন কন্টেন্ট দেখাতে থাকে এবং তাদের দীর্ঘ সময় ধরে অ্যাপে সংযুক্ত থাকতে উৎসাহিত করে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলস ও স্টোরিজ অতিরিক্ত বা বাধ্যবাধকতামূলক ব্যবহারে অবদান রাখতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে মেটার নেয়া পদক্ষেপগুলোরও সমালোচনা করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাদের ভাষ্য, সময় ব্যবস্থাপনার সরঞ্জামগুলো সহজেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের ফিচারগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট সময়, প্রচেষ্টা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রয়োজন হয়।
কমিশন জানিয়েছে, মেটার উচিত অটোপ্লে ও ইনফিনিট স্ক্রলের মতো ফিচারগুলো ডিফল্টভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা, স্ক্রিন-টাইম বিরতি চালু করা এবং সুপারিশ ব্যবস্থাকে ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিতে কম মনোযোগী করে তোলা।
অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত মেটার
মেটার মুখপাত্র বেন ওয়াল্টার্স বলেন, ‘এই প্রাথমিক ফলাফলের সঙ্গে আমরা দ্বিমত পোষণ করছি। কিশোরদের রক্ষায় আমরা যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছি, সেটি সঠিকভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা টিন অ্যাকাউন্টস চালু করেছি, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিশোরদের রক্ষা করে এবং অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি তাদের রাতে ইনস্টাগ্রাম অ্যাক্সেস বন্ধ করতে এবং দৈনিক স্ক্রিন টাইম মাত্র ১৫ মিনিটে সীমিত রাখতে দেয়।’
মেটা আরও জানিয়েছে, তারা ইইউর নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে সম্পর্ক বজায় রেখে চলবে।
ইইউর প্রযুক্তি বিষয়ক প্রধান হেন্না ভিরকুনেন রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমাদের প্রাথমিক অবস্থান হচ্ছে, আমাদের অনুসন্ধান অনুযায়ী এই নকশা অত্যন্ত আসক্তিকর এবং এতে পরিবর্তন আনতে হবে। পরবর্তী ধাপ হচ্ছে, মেটা হয় তার নকশা পরিবর্তন করবে অথবা বিধি লঙ্ঘনের সিদ্ধান্ত আসবে।’
কোম্পানিটি তার বৈশ্বিক বার্ষিক টার্নওভারের ৬ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানার ঝুঁকিতে রয়েছে। আগামী মাসগুলোতে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অভিযোগের জবাব দিতে পারবে মেটা।
ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশুদের কাছে আসক্তিকর—যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের এই দাবি খারিজ করার চেষ্টা গত মাসে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটির।
মেটার বিরুদ্ধে ইইউর এই অভিযোগগুলো ফেব্রুয়ারিতে টিকটকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগেরই প্রতিফলন। ওই সময় নিয়ন্ত্রকরা টিকটকের অ্যাপে অনুরূপ পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিলেন।
কমিশন পৃথকভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের সুপারিশ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট ‘র্যাবিট হোল’ প্রভাব নিয়েও তদন্ত করছে। এই প্রভাবে ব্যবহারকারীরা অ্যালগরিদমের সুপারিশের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে অনুরূপ কন্টেন্ট দেখতে বাধ্য হন। এপ্রিলে ঘোষিত আরেকটি মামলায় ১৩ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রবেশ ঠেকাতে মেটাকে আরও পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে ব্যর্থ হলে জরিমানার মুখে পড়তে হবে।
সোমবার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে ফলাফল পাওয়ার কথা কমিশনের। এটি ইউরোপজুড়ে কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পথ প্রশস্ত করতে পারে। কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন সেপ্টেম্বরে তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে এই ঘোষণা দিতে পারেন।





