চিরাচরিত বা ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুর লক্ষণ বদলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে এর ভয়াবহতা আঁচ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর নতুন লক্ষণ, এর মারাত্মক বিপদ এবং সুরক্ষার উপায় নিয়ে একটি তথ্যবহুল বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো:
আরও পড়ুন:
ছদ্মবেশী ডেঙ্গুর নতুন লক্ষণ ও চরিত্র (New symptoms of dengue virus)
চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডেঙ্গুর চেনা রূপ এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। আগে ডেঙ্গু হলে তীব্র জ্বর, চোখে ব্যথা, পিঠ ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে একে 'হাড়ভাঙা জ্বর' বলা হতো। পাশাপাশি শরীরে লালচে র্যাশ (Dengue skin rash) ওঠার মতো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানের ডেঙ্গু অনেক বেশি ছদ্মবেশী ও বিপজ্জনক।
লক্ষণহীন বা মৃদু জ্বর (Asymptomatic or mild dengue fever): অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না যে তিনি ডেঙ্গু পজিটিভ। সামান্য একটু জ্বর বা শরীর ম্যাজম্যাজ করার দু-এক দিনের মধ্যেই হঠাৎ করে রোগীর অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটছে।
জ্বর কমলেই আসল বিপদ বা 'ক্রিটিক্যাল ফেজ' (Dengue critical phase details): আগে ধারণা করা হতো জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী সুস্থ হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানের ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জ্বর কমে যাওয়ার পরেই আসল জটিলতা শুরু হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’। জ্বর যেদিন কমে, সেদিন থেকে পরবর্তী ৩ দিন রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং প্লাটিলেট দ্রুত কমে যাওয়ার (Dengue platelet drop treatment) প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়েই প্লাটিলেট কাউন্ট নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
আরও পড়ুন:
দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (Dengue impact on liver and kidney)
নতুন চরিত্রের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগীর লিভার, কিডনি বা মস্তিষ্ক খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তীব্র জ্বরের চেয়ে এখন নিচের উপসর্গগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে:
- তীব্র পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া (Severe abdominal pain and vomiting)।
- পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি (Diarrhea and extreme fatigue due to dengue)।
লিভার আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ (Dengue warning signs for liver damage): ডেঙ্গু রোগীর প্রচুর বমি, পেটের ডানপাশের ওপরের দিকে তীব্র ব্যথা এবং জন্ডিস দেখা দিলে বুঝতে হবে লিভার আক্রান্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ডাবল ইনফেকশন ও ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের ঝুঁকি (Dengue hemorrhagic fever and shock syndrome)
ডেঙ্গু ভাইরাসের মূলত ৪টি ভেরিয়েন্ট বা সেরোটাইপ (Dengue virus variants DEN-1, 2, 3, 4) রয়েছে।
বিপদের কারণ (The Danger): অতীতে যেকোনো একটি ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি দ্বিতীয়বার অন্য কোনো নতুন ভেরিয়েন্টে আক্রান্ত হন, তবে তাকে 'ডাবল ইনফেকশন' বলা হয়। এর ফলে রোগীর 'ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার' কিংবা 'ডেঙ্গু শক সিনড্রোম' (Dengue shock syndrome risk)-এর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়, যা অনেক সময় সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
আরও পড়ুন:
নতুন পরিস্থিতিতে নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন যেভাবে (Dengue prevention and control strategies)
ডেঙ্গুর এই বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের সচেতনতা ও প্রতিরোধকৌশলেও পরিবর্তন আনা জরুরি-
- সামান্য জ্বর বা গা ম্যাজম্যাজ করলেও ঘরে বসে না থেকে প্রথম দিনই ডেঙ্গুর এনএস১ অ্যান্টিজেন টেস্ট (Dengue NS1 antigen test cost) করিয়ে নিন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না; কেবল প্যারাসিটামল সেবন করা নিরাপদ।
- ঘরের ভেতরে এবং আশেপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করুন, যাতে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি (Aedes mosquito breeding sites) রোধ করা যায়। দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করুন।
আরও পড়ুন:
একনজরে বদলে যাওয়া ডেঙ্গুর নতুন লক্ষণ ও চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শ (Dengue New Symptoms and Medical Guidelines at a Glance)
* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা যেকোনো **ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ সেবন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ** (এতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হতে পারে)।
* জ্বর বা ব্যথার জন্য কেবল নির্দিষ্ট ডোজে প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে। রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি ও ওআরএস (ORS) স্যালাইন খাওয়ান।
বিষয় ও রূপ
(Subject & Phase)ডেঙ্গুর নতুন চারিত্রিক পরিবর্তন ও লক্ষণ
(New Symptoms & Warning Signs)চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শ
(Medical Guidelines)
ছদ্মবেশী লক্ষণ
(Atypical Fever)* তীব্র জ্বর বা হাড়ভাঙা ব্যথার বদলে মৃদু জ্বর বা গা ম্যাজম্যাজ করে।
* স্পষ্ট লালচে র্যাশ (Skin Rash) বা চোখে ব্যথা এখন আর তেমন দেখা যায় না।জ্বর বা গা ম্যাজম্যাজ করার প্রথম দিনই চিকিৎসকের পরামর্শে **NS1 Antigen Test** করিয়ে নিন।
ক্রিটিক্যাল ফেজ
(Critical Phase)* জ্বর কমে যাওয়ার পর থেকে পরবর্তী ৩ দিন আসল বিপদ শুরু হয়।
* এ সময় হঠাৎ রক্তচাপ (Blood Pressure) ও প্লাটিলেট দ্রুত ড্রপ করে।
অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতি
(Organ Impact)* ভাইরাসটি দ্রুত লিভার (Liver), কিডনি বা মস্তিষ্ক আক্রমণ করছে।
* অনবরত বমি, পেটের ডানপাশের ওপরের দিকে তীব্র ব্যথা ও জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেয়।বমি, তীব্র পেটব্যথা বা পাতলা পায়খানা হলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করুন।
ডাবল ইনফেকশন
(Double Infection)* পূর্বে ডেঙ্গু হওয়া ব্যক্তি নতুন ভেরিয়েন্টে (DEN-1, 2, 3, 4) আক্রান্ত হওয়া।
* এর ফলে **'ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম'** বা হেমোরেজিক ফিভারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে কোনো ধরণের ঝুঁকি না নিয়ে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকুন ও প্লাটিলেট মনিটর করুন।
জরুরি সতর্কতা
(Medication Warning)
আরও পড়ুন:





