বুকভরে শ্বাস নেয়ার অধিকারটুকু বাঁচিয়ে রাখব তো?

বিশ্ব পরিবেশ দিবস

বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস | ছবি: সংগৃহীত
0

সকালবেলা জানালা খুলতেই একসময় যে নির্মল বাতাস মুখে এসে লাগত; এখন সেখানে ধুলো, ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধের ভারী উপস্থিতি। শহরের কংক্রিটের দেয়াল, যানবাহনের কালো ধোঁয়া আর নির্বিচারে গাছ কাটার মধ্যে প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বস্তির নিঃশ্বাস। নদী, বন আর পাখির কোলাহলে ভরা পৃথিবী আজ যেন ক্লান্ত এক গ্রহে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ, নদী দখল, প্লাস্টিকের আগ্রাসন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ভয়াবহ প্রভাব এখন আর কেবল গবেষণার বিষয় নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ৫ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। দিবসটি উপলক্ষে দেশে-বিদেশে নানা কর্মসূচি, সেমিনার, র‌্যালি ও সচেতনতামূলক আয়োজন থাকলেও মূল প্রশ্নটি থেকে যায়, আমরা কি সত্যিই পরিবেশ রক্ষায় বদলাতে পেরেছি নিজেদের জীবনযাত্রা ও মানসিকতা?

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সূচনা হয়েছিল ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘মানবিক পরিবেশ সম্মেলন’ থেকে। শিল্পায়নের নামে নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংসের পরিণতি তখন বিশ্ববাসী উপলব্ধি করতে শুরু করে। সম্মেলনে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় যে, পরিবেশ রক্ষা ছাড়া মানবসভ্যতার টিকে থাকা সম্ভব নয়।

সেই সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। শুরুতে এটি ছিল সচেতনতা তৈরির একটি উদ্যোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। কারণ, পৃথিবী এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে পরিবেশ ধ্বংস মানেই মানুষের জীবন ও অর্থনীতির বিপর্যয়।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস |ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে এখন সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সংকট জলবায়ু পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেবে। এখন সেই আশঙ্কাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল মানেই এখন দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একসময় যে গরম ছিল মৌসুমি, এখন তা হয়ে উঠেছে অসহনীয় ও দীর্ঘস্থায়ী। অতিরিক্ত গরমে বাড়ছে অসুস্থতা, কমছে শ্রমক্ষমতা, বিপর্যস্ত হচ্ছে কৃষি।

শুধু তাপমাত্রাই নয়, বদলে গেছে বৃষ্টিপাতের ধরনও। বর্ষাকালে বৃষ্টি কম, আবার অপ্রয়োজনে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা দেখা যাচ্ছে। কৃষকরা বুঝতে পারছেন না কখন বীজ বপন করবেন, কখন ফসল কাটবেন। ফলে কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও বেড়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙন এখন আরও ঘনঘন হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত জীবিকা হারাচ্ছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বহু মানুষ ‘জলবায়ু শরণার্থী’ হয়ে শহরমুখী হচ্ছেন।

বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় প্রায়ই উঠে আসে ঢাকার নাম। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগ ও নানা জটিলতা বাড়ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, নির্মাণকাজের ধুলো, পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা ও শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

এদিকে নদীগুলোও হারাচ্ছে তাদের স্বাভাবিক প্রাণ। শিল্পবর্জ্য, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। অনেক নদী দখল ও দূষণের কারণে কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। নদী ও খাল হারানোর ফলে জলাবদ্ধতাও বাড়ছে শহরে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস |ছবি: সংগৃহীত

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু নোংরা পরিবেশের সমস্যা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রে ঢুকে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। অর্থাৎ মানুষ নিজের তৈরি দূষণের শিকার নিজেই।

এবারের প্রতিপাদ্যে প্রকৃতি থেকে শেখার কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতির নিজস্ব একটি ভারসাম্য আছে। সেখানে অপচয় নেই, অতিরিক্ত ভোগ নেই। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা কেবল ভোগ করতেই শিখেছে। ফলে প্রকৃতির ওপর চাপও বেড়েছে বহুগুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ রক্ষায় শুধু নীতিমালা যথেষ্ট নয়; মানুষের আচরণগত পরিবর্তন জরুরি। প্রতিদিনের ছোট ছোট সচেতনতা বড় পরিবর্তন আনতে পারে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমাতে হবে। বাজারে গেলে কাপড় বা পাটের ব্যাগ ব্যবহারের অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শহরে সবুজ কমে যাচ্ছে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা খালি জায়গায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাড়াতে হবে। গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানির অপচয় রোধ করতে হবে। এতে কার্বন নিঃসরণও কমবে। বিশুদ্ধ পানির সংকট দিন দিন বাড়ছে। তাই দৈনন্দিন জীবনে পানির অপচয় বন্ধ করা জরুরি।

বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নদী দখল, বন উজাড় এবং দুর্বল বাস্তবায়ন ব্যবস্থা। পরিবেশ আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার কার্যকর প্রয়োগ দেখা যায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন ও পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করানো যাবে না। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করেই পরিকল্পনা নিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে কার্যকর করারও তাগিদ দেন তারা।

পরিবেশ দূষণের প্রতীকী ছবি |ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক র‌্যালি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সেমিনার ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও পরিবেশ রক্ষার বার্তা নিয়ে অংশ নিচ্ছে নানা কর্মসূচিতে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বছরের প্রতিটি দিনই পরিবেশ রক্ষার চর্চা থাকতে হবে। প্রতিটি গাছ কাটার আগে ভাবতে হবে, প্রতিটি প্লাস্টিক ফেলার আগে বিবেককে প্রশ্ন করতে হবে। কারণ, পরিবেশ রক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি বেঁচে থাকার শর্ত। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে একটি বিষাক্ত, উষ্ণ ও বাস অযোগ্য পৃথিবী।

সময় এসেছে প্রকৃতিকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে না দেখে, অস্তিত্বের অংশ হিসেবে ভাবার। বুকভরে শ্বাস নেয়ার অধিকারটুকু বাঁচিয়ে রাখতে হলে বদলাতে হবে অভ্যাস, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ।

এনএইচ