গ্রিসজুড়ে ছড়াচ্ছে দাবানল, বিপর্যস্ত ফ্রান্স ও স্পেন

আগুনের পেছনে জ্বলছে গাছ, পাশে দাঁড়িয়ে দমকলকর্মী
আগুনের পেছনে জ্বলছে গাছ, পাশে দাঁড়িয়ে দমকলকর্মী | ছবি: রয়টার্স
0

প্রবল বাতাসের কারণে গতকাল (শনিবার, ১ আগস্ট) গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বাসিন্দাদের ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। এদিকে স্পেন ও ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় দাবানল পরিস্থিতি নতুন করে খারাপ হয়েছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গ্রিসে ভয়াবহ রূপ নেয়া একটি দাবানল ঠেকাতে গিয়ে দমকল কর্মী, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সকে ধীরে ধীরে পিছু হটতে হয়। বনভূমি ও ঝোপঝাড় গ্রাস করে ফেলা আগুন ও ধোঁয়ার বিশাল দেয়ালের সামনে তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। ঘটনাটি ঘটেছে অ্যাথেন্স থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে করিন্থ উপসাগরের পোর্তো জারমেনোর কাছে।

চিকিৎসক ও প্রথম উদ্ধারকারী গিওর্গোস দৌলাস বলেন, ‘পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে আজ। বাতাসের গতি ভীষণ; দমকা বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ৭৩ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আগুন কোন দিকে ছড়াচ্ছে, তা সহজে নির্ণয় করা যাচ্ছে না।’

একের পর এক রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টিহীন সময় পার করে চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপ দাবানলে বিপর্যস্ত। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। কিছুদিন কিছুটা শান্ত থাকার পর গত কয়েক দিনে গ্রিসে আবারও কয়েকটি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে।

অ্যাথেন্সের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আগিয়া পারাসকেভি, ক্রিও পিগাদি ও আগিওস নেকতারিওস শহরের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আগুনের বিস্তার থামাতে হেলিকপ্টার থেকে পানি ও অগ্নি নিরোধক ছিটানো হচ্ছে।

ক্রিও পিগাদির ৬৫ বছর বয়সী বাসিন্দা ইলিয়াস পাপাদিমিত্রোপুলোস বলেন, ‘প্রতি গ্রীষ্মেই আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি; আগুন লাগবে কি না। এই আতঙ্ক নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। যা দেখছি, পরিস্থিতি খুব কঠিন।’ এর আগে আগিওস ভাসিলেইওস শহর থেকে সমুদ্রপথে ২০০ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। রোববারের জন্য বোয়েতিয়া, আটিকা ও এভিয়া অঞ্চলে দাবানলের চরম ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকা ভার-এ তিন দিন আগে নিয়ন্ত্রণে আসা একটি দাবানল শুক্রবার আবার জ্বলে ওঠে। এতে সারা রাত ধরে প্রায় ২৫০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসক সিমন বাব্র শনিবার বিএফএম টিভিকে জানান, দাবানলটি আবার স্থিতিশীল হওয়ার আগে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকা পুড়িয়ে দিয়েছে।

ভার অঞ্চলের মোঁফোর-সুর-আরজঁ এলাকায় কৃষকেরা দমকল বাহিনীর ট্রাক ও হেলিকপ্টারে পানি ভরার কাজে সহায়তা করছেন। মদ প্রস্তুতকারক ফ্রেদেরিক আমবার্দ বলেন, ‘এই ভয়ংকর বছরের মধ্যেও আমরা আশাবাদী। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে দাবানল আমাদের কাছে নতুন নয়। আমরা সবসময়ই ঘুরে দাঁড়িয়েছি, ধীরে ধীরে সব পুনর্নির্মিত হবে।’

স্পেন শনিবার একাধিক দাবানল কেন্দ্রে লড়াই চালিয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় প্রদেশগুলোতে বড় দাবানলজনিত জাতীয় জরুরি অবস্থার সমাপ্তি ঘোষণার দুই দিনের মধ্যেই আবার এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তরাঞ্চলীয় লেওন প্রদেশে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে গত রাতে একটি নতুন দাবানল শুরু হয়েছে, একটি এখনো সক্রিয় এবং তৃতীয়টির অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো।

পাশের সামোরা প্রদেশে ১১ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে যাওয়া একটি দাবানলের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এতে সরিয়ে নেয়া ১৪টি শহর আবার চালু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় কাসতেয়ন প্রদেশে ভাল দ’উইক্সো দাবানল সাত দিন পর নিয়ন্ত্রণে এসেছে। প্রায় ১০ হাজার হেক্টর এলাকা পুড়ে যাওয়ার পর সরিয়ে নেয়া বাসিন্দাদের সবাই এখন বাড়ি ফিরতে পারবেন। পুলিশ বলছে, দুটি পৃথক জায়গা থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় তারা পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের সন্দেহ করছে।

মাদ্রিদ ও আভিলার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বড় দাবানল, যেগুলোতে ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গিয়েছিল, সেগুলোও এখন নিয়ন্ত্রণে। রাজধানীর পশ্চিমে সান হুয়ান জলাধারের কাছে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া আগুন শুক্রবার নেভানো হয়েছে।

চরম আবহাওয়ার প্রভাব শুধু দাবানলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছর জুনে গরমজনিত কারণে ৩৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা রেকর্ড। চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাজ্য জানায়, চলতি বছর গরমজনিত কারণে দেশটিতে আনুমানিক ২ হাজার ৮৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে গত ১৭ জুন থেকে ২ জুলাইয়ের মধ্যে অতিরিক্ত ৫ হাজার ৭৬৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। জার্মানির আরকেআই স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, চলতি বছর দেশটিতে গরমজনিত কারণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ হাজার ৮০০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এএম