Recent event

একটির দাম ২৮০০০ টাকা; আফ্রিকার যে পিঁপড়ার তথ্য আপনাকে চমকে দেবে

জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট
জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট | ছবি: সংগৃহীত
4

কেনিয়ার নাইরোবির আদালত প্রাঙ্গণে সম্প্রতি জব্দ হওয়া পাঁচ হাজার জীবিত পিঁপড়ার চালান চমকের সৃষ্টি করেছে। ঘাসভূমিতে জন্মানো এই ‘জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট’ (Giant Harvester Ant)—একটির দাম ২৮,০০০ টাকা (২৩৩ ডলারের বেশি)। হাতির দাঁত বা গন্ডারের শিংয়ের মতো প্রচলিত মূল্যবান সামগ্রী নয়, তবু আন্তর্জাতিক চোরাচালানের (International Smuggling) নতুন শিকারের মধ্যে এটি উঠে এসেছে।

জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট’র জীবনবৃত্তান্ত |ছবি: এখন টিভি

বিবরণ (Description) তথ্য (Information)
সবচেয়ে মূল্যবান রানী পিঁপড়া (Queen Ant)
রানী পিঁপড়ার আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর
প্রতিটির বাজারমূল্য ১৩০ থেকে ২৩৩ ডলার (প্রায় ২৮,০০০ টাকা)
প্রধান বৈশিষ্ট্য বীজ থেকে ‘অ্যান্ট ব্রেড’ তৈরি ও কলোনি স্থাপন

পাচারের পথে বিশাল চালান জব্দ (Seizure of Ant Shipment)

গত বছরের এপ্রিলে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে ইউরোপে পাচারের পথে ধরা পড়ে ২ হাজার ২৪৪টি টেস্টটিউবে ভরা এই পিঁপড়া। গ্রেপ্তার হন দুই বেলজিয়ান তরুণ, এক ভিয়েতনামি নাগরিক ও তাদের এক কেনিয়ান সহযোগী। স্থানীয় হিসাবে জব্দকৃত পিঁপড়ার দাম প্রায় ৯ হাজার ৩০০ ডলার হলেও ইউরোপের বাজারে পৌঁছালে এই চালানের মূল্য দাঁড়াতো প্রায় এক মিলিয়ন ডলারের (Million Dollar Shipment) কাছাকাছি বলে বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছেন।

জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট |ছবি: সংগৃহীত

কেন এত দাম একটি পিঁপড়ার (Why is this Ant so Expensive?)

‘জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট’ মূলত কেনিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি অঞ্চলে পাওয়া যায়। এরা পরিচিত ‘বীজ সংগ্রাহক’ হিসেবে পরিচিত। ঘাস ও শস্যের বীজ কুড়িয়ে এনে মাটির নিচে বিশাল বাসা তৈরি করে সংরক্ষণ করে। এই বীজ থেকেই তারা তৈরি করে বিশেষ খাদ্য, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘অ্যান্ট ব্রেড’।

এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো রানী পিঁপড়া (Queen Ant)। একটি কলোনি গড়ে উঠতে রানী অপরিহার্য। এই রানী পিঁপড়া আয়ুষ্কাল (Lifespan) ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই রানীই পুরো কলোনির জন্মদাত্রী হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে একেকটি রানীর পিঁপড়ার দাম ১৩০ থেকে ২৩৩ ডলার পর্যন্ত (২৮ হাজার টাকার বেশি)। ব্রিটেনে খুচরা বিক্রেতাদের গড় হিসাবে দাম ধরা হয় প্রায় ২৩৩ ডলার।

ফর্মিকারিয়ামে পিঁপড়া |ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপে কেন এত চাহিদা? (Why high demand Giant Harvester Ant)

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘অ্যান্ট-কিপিং’ (Ant-keeping) এখন তাদের ‘নতুন শখ’ (New Hobby)। যার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। স্বচ্ছ পাত্র বা ফর্মিকারিয়ামে (Formicarium) পিঁপড়ার বাসা বানিয়ে তাদের জীবনযাপন দেখেন শৌখিন সংগ্রাহকেরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারেও (Research Labs) এই পিঁপড়ার কদর সম্প্রতিতে বেড়েছে। বড় আকার, চকচকে মেহগনি রঙ আর শক্তিশালী কর্মী পিঁপড়ার কারণে জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট হয়ে উঠেছে প্রদর্শনযোগ্য প্রজাতি।

কিন্তু কেনিয়ার বন্যপ্রাণী আইনে (Wildlife Law) এই পিঁপড়া বেচাকেনা নিষিদ্ধ। ফলে বৈধ পথে রপ্তানি প্রায় অসম্ভব। নিষেধাজ্ঞাই উল্টো চোরাচালানকে আরও লাভজনক করে তুলেছে।

জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্টকে সামান্য খাবার ও আর্দ্র তুলা দিয়ে টেস্ট টিউবে ভরে পাচার করা হয় |ছবি: সংগৃহীত

পাচারের পথ (Trafficking Routes)

পাচার চক্রটি সাধারণত বর্ষার পর রাতে রানী পিঁপড়া ধরে। প্রতিটি রানী আলাদা টেস্টটিউবে ভরে সামান্য খাবার ও আর্দ্র তুলা দেয়া হয়। এরপর লাগেজে লুকিয়ে বিমানবন্দর পার করে কিংবা কুরিয়ারে ‘বৈজ্ঞানিক নমুনা’ (Scientific Samples) নামে পাঠানো হয়। ইউরোপে পৌঁছে অনলাইন ফোরাম ও স্পেশাল দোকানে বিক্রি হয় এসব পিঁপড়া। একটি চালানে খরচ পড়ে কয়েক হাজার ডলার, আর বিক্রি হলে লাভ হয় প্রায় দশ গুণের বেশি।

ফর্মিকারিয়াম |ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশের জন্য ঝুঁকি (Risk to the Environment)

বিজ্ঞানীদের মতে, হাজার হাজার রানী পিঁপড়া তুলে নেয়া মানে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কলোনির (Future Colony) সম্ভাবনা ধ্বংস করা। এতে বীজ ছড়ানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, মাটির উর্বরতা কমে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রে (Ecosystem) ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারপোল (Interpol) ও কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জার্ড স্পিসিজ অব ওয়াইল্ড ফণা অ্যান্ড ফ্লোরা-সিআইটিইএস’র (CITES) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ ঠেকানো কঠিন হবে।

মূল বৈশিষ্ট্য ও তথ্য

আকার ও ধরন: রানী ১৮-২০ মিমি এবং শ্রমিকরা ৫-১৪ মিমি (মেজররা ১৮ মিমি পর্যন্ত) হয়। Messor cephalotes বিশ্বের বৃহত্তম হারভেস্টার পিঁপড়াগুলোর মধ্যে একটি।

বাসস্থান: মরুভূমি বা শুষ্ক অঞ্চলে এরা মাটির নিচে গভীর বাসা তৈরি করে। বাসাগুলো ২-৪ মিটার চওড়া হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাস: ৭০ শতাংশ খাবার হলো বীজ, এছাড়া শর্করাযুক্ত পানি এবং প্রোটিন হিসেবে ছোট পোকামাকড় খায়।

আচরণ ও হুল: এরা অত্যন্ত সংগঠিত এবং তাদের হুল অত্যন্ত বেদনাদায়ক হতে পারে। Maricopa harvester ants-এর হুল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত পোকামাকড়ের হুলের অন্যতম।

পেশাদার প্রতিপালন: এরা অ্যাক্রাইলিক বা প্রাকৃতিক নেস্টে (ants farm) থাকতে পছন্দ করে। তাপমাত্রা ২১-২৮°C এবং আর্দ্রতা ৫০-৭০%-এর মধ্যে রাখা প্রয়োজন।

রক্ষার উপায় কী? (Ways to Protect)

এদিকে কেনিয়া সরকার পিঁপড়া পাচারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা করছে। পাশাপাশি বৈধ প্রজনন খামার (Legal Breeding Farms) গড়ে তোলার প্রস্তাব উঠেছে, যাতে নিয়ন্ত্রিতভাবে পিঁপড়া উৎপাদন করে রপ্তানি করা যায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হয়।

জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট শুধু একটি পিঁপড়া নয়—এটি আফ্রিকার বাস্তুতন্ত্রের নীরব রক্ষক। বীজ সংগ্রহ, মাটি খনন আর জটিল সামাজিক কাঠামোর (Social Structure) মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে তারা। কিন্তু মানুষের লোভ এই ক্ষুদ্র প্রাণীকেও আন্তর্জাতিক পাচারের শিকারে পরিণত করেছে।

প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই ছোট নয়। একটি রানী পিঁপড়া মানে একটি ভবিষ্যৎ কলোনি, একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সেই বাস্তবতা ভুলে গেলে ক্ষতি হবে শুধু কেনিয়ার নয়, গোটা পৃথিবীর।

আফ্রিকার জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: একটি পিঁপড়ার দাম ২৮,০০০ টাকা হওয়ার কারণ কী? (Why is a single ant so expensive?)

উত্তর: এই দাম মূলত ‘রানী’ পিঁপড়ার (Queen Ant) জন্য। ইউরোপ ও আমেরিকায় পিঁপড়া পালনের শখ (Ant-keeping) বাড়ায় বিরল প্রজাতির এই বড় ও উজ্জ্বল রঙের রানীর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন: জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট কোথায় পাওয়া যায়? (Where are Giant Harvester Ants found?)

উত্তর: এই প্রজাতিটি মূলত কেনিয়া (Kenya) এবং পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘাসভূমি অঞ্চলে পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: রানী পিঁপড়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? (Why is the Queen Ant so important?)

উত্তর: একটি রানীর মাধ্যমেই নতুন কলোনি (Colony) স্থাপন সম্ভব। সে একা একটি পুরো কলোনির জন্মদাত্রী এবং সে ছাড়া কলোনি টিকে থাকতে পারে না।

প্রশ্ন: এই পিঁপড়ার গড় আয়ু কত? (What is the average lifespan of these ants?)

উত্তর: এই প্রজাতির একটি রানী পিঁপড়া প্রায় ১৫ থেকে ২৫ বছর (15 to 25 years) পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

প্রশ্ন: ‘অ্যান্ট ব্রেড’ কী এবং পিঁপড়ারা এটি কীভাবে বানায়? (What is Ant Bread?)

উত্তর: এই পিঁপড়ারা শস্য ও ঘাসের বীজ সংগ্রহ করে মাটির নিচে জমিয়ে রাখে। সেই বীজ থেকে তারা এক ধরনের বিশেষ খাদ্য তৈরি করে যাকে বিজ্ঞানীরা ‘অ্যান্ট ব্রেড’ (Ant bread) বলেন।

প্রশ্ন: ইউরোপে কেন এই পিঁপড়ার এত চাহিদা? (Why high demand in Europe?)

উত্তর: ইউরোপের শৌখিন সংগ্রাহকরা স্বচ্ছ কাঁচের পাত্রে (Formicarium) পিঁপড়ার জীবনযাপন দেখতে পছন্দ করেন। এছাড়া গবেষণাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এদের ব্যাপক কদর রয়েছে।

প্রশ্ন: কেনিয়াতে কি এই পিঁপড়া কেনাবেচা বৈধ? (Is it legal to trade these ants in Kenya?)

উত্তর: না, কেনিয়ার বন্যপ্রাণী আইন (Wildlife Law) অনুযায়ী এই পিঁপড়া ধরা বা কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

প্রশ্ন: পাচারকারীরা কীভাবে এই পিঁপড়াগুলো বিদেশে পাঠায়? (How are these ants smuggled?)

উত্তর: সাধারণত রানী পিঁপড়াদের আলাদা আলাদা টেস্টটিউবে ভরে লাগেজের ভেতরে লুকিয়ে কিংবা ‘বৈজ্ঞানিক নমুনা’ (Scientific samples) নাম দিয়ে কুরিয়ারে পাচার করা হয়।

প্রশ্ন: চোরাচালানের এই চালানের বাজারমূল্য কত হতে পারে? (What is the market value of smuggled ants?)

উত্তর: সম্প্রতি কেনিয়াতে জব্দ হওয়া চালানের স্থানীয় দাম ৯,৩০০ ডলার হলেও ইউরোপের বাজারে এর মূল্য প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার (১০০ কোটি টাকার কাছাকাছি) হতে পারতো।

প্রশ্ন: এই পিঁপড়া ধরা কি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর? (Is catching these ants harmful to environment?)

উত্তর: হ্যাঁ, হাজার হাজার রানী পিঁপড়া সরিয়ে নিলে ওই অঞ্চলে নতুন কলোনি হবে না, যা বীজ ছড়ানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত করে এবং মাটির উর্বরতা (Soil fertility) কমিয়ে দেয়।

প্রশ্ন: ‘অ্যান্ট-কিপিং’ শখটি আসলে কী? (What is Ant-keeping hobby?)

উত্তর: এটি একটি শখ যেখানে মানুষ বাড়িতে কৃত্রিমভাবে মাটির বাসার পরিবেশ তৈরি করে পিঁপড়ার সামাজিক কাঠামো ও কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে।

প্রশ্ন: পাচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থা কাজ করছে? (Which international organizations are involved?)

উত্তর: ইন্টারপোল (Interpol) এবং বন্যপ্রাণী রক্ষা সংস্থা সিআইটিইএস (CITES) এ ধরনের আন্তর্জাতিক চোরাচালান বন্ধে কাজ করছে।

প্রশ্ন: এই পিঁপড়াগুলো দেখতে কেমন? (What do these ants look like?)

উত্তর: জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট আকারে বেশ বড় এবং গায়ের রং আকর্ষণীয় মেহগনি (Mahogany) বা চকচকে বাদামী হয়ে থাকে।

প্রশ্ন: কেনিয়া সরকার কি এই বিষয়ে কোনো নতুন আইন করছে? (Is Kenya making new laws for ants?)

উত্তর: হ্যাঁ, কেনিয়া সরকার এখন পিঁপড়া পাচারকে ‘গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইন করার কথা ভাবছে।

প্রশ্ন: পিঁপড়ার পাচার বন্ধের কোনো বিকল্প উপায় আছে? (Are there alternatives to stop ant smuggling?)

উত্তর: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘প্রজনন খামার’ (Breeding farms) তৈরি করলে বৈধ পথে রপ্তানি করে স্থানীয়রা লাভবান হবে এবং পাচার কমবে।

এএম