সিরাজগঞ্জের মাঠজুড়ে এখন কেবলই সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ জনপদ ঢেকে আছে বোরো ধানের চাদরে। কৃষকের নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এ ফসলে স্বপ্ন থাকলেও, সেই স্বপ্নের গায়ে বিঁধছে সেচ খরচের কাঁটা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো এ সবুজ ফসল কাটার আগেই বড় একটি অংশ গিলে খাওয়ার অপেক্ষায় সেচ মালিকদের সিন্ডিকেট।
সদর উপজেলার ছোনগাছা গ্রামের কৃষক বাদশা মিয়া। কাঠফাটা রোদে ঘাম ঝরিয়ে মাঠের ফসল আগলে রাখলেও সেই পরিশ্রমের অর্ধেকই যেন চলে যাচ্ছে সেচ খরচে। ফসল কাটার সময় তাকে সেচ বাবদ গুনতে হবে মোট উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ ধান। সিরাজগঞ্জ ছোনগাছার বাদশা মিয়া বলেন, ‘কৃষকদের ভয় ভীতি দেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত।’
শুধু বাদশাই নন, জেলার অধিকাংশ কৃষকেরই একই দশা। বর্তমানে ধানের বাজার দর অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় এ সেচ খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। অথচ সরকার সেচের ওপর ২০ শতাংশ ভর্তুকি দিলেও তার ছিটেফোঁটাও পৌঁছাচ্ছে না প্রান্তিক কৃষকদের কাছে। উল্টো সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছেন সেচ স্কিম মালিকরা। আমরা জমিতে যা চাষ করি তার ২৫ শতাংশ সেচ মালিককে দিয়ে দিতে হয় বলে জানান চাষীরা।
আরও পড়ুন:
জেলায় গভীর ও অগভীর মিলে ৫৭ হাজার ২৩৮টি সেচ কল রয়েছে৷ উপজেলা ভেদে সেচ কমিটি প্রতি বিঘা সেচের মূল্য ২ হাজার ৩১০ টাকা থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই। উপজেলা প্রশাসন বলছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন তারা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা সেচ কমিটির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সভাপতি মো. মামুন খান বলেন, ‘বিআরডিসির অনুমোদিত কোনো সেচ প্রকল্প যদি ধান নেয়ার মতো কাজ করে থাকে তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
জেলা কৃষি বিভাগ বিষয়টি অবগত থাকলেও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব স্পষ্ট। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়ার কথা বলছে কৃষি বিভাগ। অন্যদিকে, কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেন জেলা প্রশাসক।
আরও পড়ুন:
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ এ, কে, এম, মনজুরে মাওলা বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত সেচ প্রকল্পের যে নীতিমালা আছে তা আমরা অনুসরণ করি। কৃষকের বিষয়ে আমরাই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি।’
সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেকটা উপজেলা ও ইউনিয়নের সব কর্মকর্তাদের বলা হবে ধান কাটার সময় যেন কৃষকদের কাছ থেকে সেচের মূল্যের জন্য টাকা ছাড়া অন্য কিছু না নিতে পারে।’
সেচ কমিটির দায়িত্ব কি শুধু কাগজ-কলমে মূল্য নির্ধারণ, নাকি তার সঠিক বাস্তবায়নে তদারকি করা—এমন প্রশ্ন কৃষকদের।
সেচ স্কিম মালিকদের বেধে দেয়া ‘সিকি’ প্রথায় জিম্মি হয়ে পড়েছে জেলার অধিকাংশ কৃষক। ধান কাটা শুরু হলেই সেচ বাবদ কৃষককে পরিশোধ করতে হবে উৎপাদনের চার ভাগের এক ভাগ, যা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ। কৃষকরা বলছেন, দ্রুত এ সেচ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষককের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় এর বিরুপ প্রভাব পড়বে ধানের বাজারে। যার মাশুল দিতে হবে কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়েও।





