পদ্মা ও ধলেশ্বরীর অববাহিকায় বিস্তৃত প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটারের আড়িয়াল বিল। একসময় এই জলাভূমি ছিল দেশি মাছের অন্যতম আধার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বিলের চিত্র। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমেছে, বেড়েছে দূষণ। তার প্রভাব পড়েছে বিলের মাছেও।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা, টেংরা ও পুঁটি মাছে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। কই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
বাকৃবি গবেষক প্রফেসর ড. মো. শাহজাহান বলেন, ‘আড়িয়াল বিলের পানি, কাদা এবং কিছু মাছ—কই মাছ, তারপরে গুলশা মাছ, পুঁটি, আ- বাটা মাছ, এই মাছগুলা আমরা নিয়ে আসি। আমরা আমাদের ল্যাবরেটরিতে এদের মাইক্রোপ্লাস্টিকের এক্সট্রাকশনের রিসার্চ করি। দেখা গেল যে হ্যাঁ, আড়িয়াল বিলের মাছেও এরকম মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের অন্যতম কারণ পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন ও দূষণ।
স্থানীয় একজন জেলে বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া করে প্লাস্টিক ফেলে রেখে গেলো, কিন্তু এইটা আমাদের বিলের ক্ষতি হয়। মাছেরও ক্ষতি হয়, আমাদের ধানেরও ক্ষতি হয়।’
আরও পড়ুন:
অন্য একজন বলেন, ‘এখন মাছের পোনা বড় হবে, ডিম ফুটবে বড় হবে, কিন্তু এখন বিলে পানি নাই। গতবারের চেয়ে এইবারে অনেক কম। কারণ বিলের পচা পানি, পানি নদী থাইকা এহন আসতে পারে না।’
স্থানীয় ভোক্তাদের মাঝেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি থাকায় প্রশ্ন উঠছে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে।
পরিবেশবিদদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু মাছের শরীরেই নয়, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগরের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সরকারে আরও অনেক উচ্চ উচ্চ নীতি নির্ধারণ পর্যায় থেকে স্টেপ নিতে হবে। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এতদিন না পর্যন্ত হবে, এই শ্রীনগরের আড়িয়াল বিলে মাছের শরীরে এই প্লাস্টিকের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার সম্ভাবনা তো থাকবেই।’
তবে বিলের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত ১৪টি খাল ও ১২টি পুকুর পুনঃখননের পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জ শ্রীনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাছিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন পরিষদগুলোকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এবং আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক অভিযান কার্যক্রম পরিচালনা করছি যাতে যত্রতত্র ময়লা ফেলা না হয়, বিশেষ করে আড়িয়াল বিলের মতো একটি জায়গা যেখানে যেটি জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।’
পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে হারিয়ে যেতে পারে আড়িয়াল বিলের জীববৈচিত্র্য, আর ঝুঁকিতে পড়তে পারে মানুষের নিরাপদ খাদ্য।





