বাঘাইছড়ির পাহাড়ে আগর চাষ; আতরের ঘ্রাণে বাড়ছে রপ্তানি

আগর গাছ কেটে রপ্তানি উপযোগী করছেন শ্রমিকরা
আগর গাছ কেটে রপ্তানি উপযোগী করছেন শ্রমিকরা | ছবি: এখন টিভি
0

রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে পাহাড়ের পতিত জমিতে বাড়ছে আগর গাছের বাণিজ্যিক চাষাবাদ। যা থেকে তৈরি হয় সুগন্ধি আতর। উৎপাদিত এই সুগন্ধি পণ্য দেশের গন্ডি পেরিয়ে ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষণ ও পুঁজির সংকট নিরসন হলে পার্বত্য অঞ্চলের লাভজনক অর্থকরী শিল্পে পরিণত হতে পারে খাতটি।

মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় রাঙামাটির দুর্গম বাঘাইছড়ির পাহাড়ি পতিত জমিতে বাড়ছে সুগন্ধি আগর গাছের বাণিজ্যিক চাষাবাদ। এরইমধ্যে সেখানে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগানে বেড়ে উঠেছে ছয় কোটির বেশি গাছ। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার বেশি।

রোগবালাইশুন্য ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী আগর গাছে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে কালো রঙের বিশেষ ছত্রাকের সংক্রমণে উৎপাদন হয় আতর তেল। এই তেল সুগন্ধি আতর, আগরবাতি, পারফিউম, তেল, লোশন ও ভেষজ ওষুধে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এসব আতর স্থানীয়ভাবে প্রতি তোলা মানভেদে ৬ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আর পরিপক্ব গাছ বিক্রি হয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকায়।

তবে স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় কাঁচামাল যাচ্ছে সিলেটে। সেখান থেকেই নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, মালয়েশিয়া, কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং বাহরাইনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘সরকার জরিপ করছে আরকি, তিন কোটির ওপরে গাছ আছে বাঘাইছড়ি শুধু বাঘাইছড়িতে।’

আরও পড়ুন:

শ্রমিকদের মধ্যে একজন বলেন, ‘সারা দিনে ১০ থেকে ১২ জনে এক বস্তা এরকম কাজ করা যায়। আর ৫-৬ জনে করলে, বড় গাছ হলে ১০-১২ জনে করলে দুই বাস্কেট বা তিন বাস্কেট এরকম কাজ করা যায়।’

চাষীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘বাইরের দেশে যায়, সৌদি আরব, দুবাই, কাতার, কুয়েত। ইউরোপ যায়, বেশি যায় আপনার আরব কান্ট্রিতে যায়। সরকারের কাছ থেকে যদি মনে করেন এটা সহযোগিতা পেলে তো আমি আবার উন্নত করে বাগান করতে পারতাম।’

এদিকে শিল্পের প্রসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড থেকে আধুনিক প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানান এই কর্মকর্তা।

রাঙামাটি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অফিসার ডজী ত্রিপুরা বলেন, ‘এটা আমাদের আসলে নজরে আসছে। যদিও এটা সবাই চায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, যেটা পরিবেশের জন্য ভালো এবং মানুষের উপকার হয় সে ধরনের প্রজেক্ট আমরা গ্রহণ করি। যদি আমরা দেখি যে, জনগণ আরও উৎসাহী হয়, তাহলে আমরা অবশ্যই এটার একটা উদ্যোগ নেবো। আমাদের ভবিষ্যতে এরকম একটা পরিকল্পনা আমরা করতে পারি।’

আরও পড়ুন:

পার্বত্যাঞ্চলের ভূমির প্রকৃতি বনায়নের জন্য উপযোগী হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশীদারিত্ব দিয়ে এরইমধ্যে বনবিভাগ ১৩ লাখ আগর গাছ রোপণ করেছে।

রাঙামাটি সার্কেলের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল সরকার বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান— এই তিন জেলায় ল্যান্ডের যে প্রকৃতি, এটি আসলে টোটালটাই হলো বনায়নের জন্য এটা উপযুক্ত ল্যান্ড। তো তারপরেও যেহেতু কিছু কিছু জায়গায় ২০০৭-০৮ সাল থেকে ২০০৯-১০ সাল, গত তিন বছরে আগর বনায়নের একটি প্রকল্প ছিল, সে প্রকল্পের আওতায় ৫১৮ হেক্টর জমিতে আগর বনায়ন করা হয়েছিল লোকাল পিপলকে অংশীদারিত্ব দিয়ে।’

দেশের এক-দশমাংশ অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপুল সম্ভাবনাময় এই আগর চাষ বাড়ানো গেলে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ আমদানি নির্ভরতা কমবে। সমৃদ্ধ হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিও। এজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে আগরের বাণিজ্য সম্প্রসারণে সরকারি বেসরকারি বিশেষায়িত পরিকল্পনা নেয়ার দাবি খাত সংশ্লিষ্টদের।

এসএস