এমন হাজারো অনুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো প্রতিদিন পুত্রের সমাধির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন মকবুল হোসেন। চব্বিশের ছাত্র-জনতার ‘গণঅভ্যুত্থানের আইকন’, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হারানোর আজ ৭৩০ দিন বা পূর্ণ দুই বছর। অথচ দীর্ঘ এসময়ে সাঈদের স্মৃতি রক্ষায় রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া বড় বড় প্রকল্পগুলোর একটিও আলোর মুখ দেখেনি। দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাবে ক্ষোভ আর আক্ষেপে ফুঁসছেন সাঈদের পরিবার ও সহযোদ্ধারা।
মাটির ঘর কিংবা নিভৃত পাড়া-গ্রাম থেকে যে ছেলেকে ঘিরে চওড়া হচ্ছিল একটি দরিদ্র পরিবারের স্বপ্ন, সেই আবু সাঈদ আজ জুলাই আন্দোলনের ‘ফিনিক্স পাখি’। কিন্তু পরিবারের কাছে তিনি শুধুই এক চিরন্তন শূন্যতা।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন ভারী গলায় বলেন, ‘জনগণ, সরকার পয়সা-কড়ি যা কিছুই দিক; কিন্তু ছেলে হারানোর কারণে আমার আত্মা কোনোদিন ঠান্ডা হবে না। আমি শুধু আমার ছেলের খুনিদের ফাঁসির রায় কার্যকর দেখতে চাই।’ অন্যদিকে সাঈদের মা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার সন্তান গেছে। সবার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, তবে আমার সন্তান দুনিয়াতে নেই, এটাই আমার সারাজীবনের দুঃখ।’
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে আবু সাঈদের সমাধি পরিদর্শন কিংবা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ যেন ছিল রাজনৈতিক নেতা ও আমলাদের এক অলিখিত নিয়ম। তবে দুই বছর পূর্তিতে এসে সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি যেন অনেকটাই ফিকে হতে শুরু করেছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ফটকে পুলিশের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল আবু সাঈদের বুক, সেখানে একটি দৃষ্টিনন্দন তোরণ ও ‘শহিদ জাদুঘর’ নির্মাণের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও, আজও সেখানে এক কোদাল মাটিও পড়েনি। সাঈদের নামে ছাত্র হল নির্মাণের ঘোষণাটি এখনো আটকে আছে প্রতিশ্রুতির লাল ফিতায়। এমনকি প্রথম বছর আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে ‘আবু সাঈদ বইমেলা’ হলেও দ্বিতীয় বর্ষে এসে সেই আয়োজনও পুরোপুরি ফিকে হয়ে গেছে।
নিজ ক্যাম্পাসে আন্দোলনের মহানায়কের স্মৃতি এভাবে উপেক্ষিত হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এক সহযোদ্ধা বলেন, ‘এমনিতেই রংপুর সব সময় বৈষম্যের শিকার। আর যিনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে এভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন, তাকেই আজ নিজ ক্যাম্পাসে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
স্মৃতি রক্ষায় গড়িমসি ও অবহেলার অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শওকত আলী। সরকারি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতাকেই তিনি এই ধীরগতির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
উপাচার্য বলেন, ‘প্রশাসনিক যে আইনি বা দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়াগুলো রয়েছে, সেগুলো ওভারকাম করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এককভাবে দায়বদ্ধ নয়। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে অর্থ বরাদ্দ ও অনুমোদনের জন্য নিয়মিত দাবি জানিয়ে আসছি।’ তবে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষে দ্রুতই প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান করার আশ্বাস দেন তিনি।
উপাচার্য আরও জানান, আবু সাঈদ হত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ইতোমধ্যেই স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
চব্বিশের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের শর্টগানের গুলির মুখে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। সেই বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের দৃশ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আবু সাঈদের সেই আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মকে আজীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে শানিত করবে উল্লেখ করে, অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তার সমস্ত স্মৃতিবিজড়িত প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি জানিয়েছেন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধারা।





