চীন-বাংলাদেশ যৌথ প্রকল্প: দৃশ্যমান রাজশাহীর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট

ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট
ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট | ছবি: এখন টিভি
0

রাজশাহীতে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ-চীনের যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্প। চার বছরের মেয়াদের এই প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার তিন বছরের মাথায় শেষ হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণ। একইসঙ্গে নগরজুড়ে পানি সরবরাহের পাইপলাইন বসানোর কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে।

ক্রমবর্ধমান নগর রাজশাহী। জনসংখ্যা ও নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে সুপেয় পানির চাহিদাও। বর্তমানে নগরীতে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি ৭০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে। এই সংকট নিরসনে ২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় অনুমোদন পায় রাজশাহীতে ভূ-উপরিস্থ পানি শোধনাগার প্রকল্প। পরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয় গোদাগাড়ী উপজেলার জোত-গোসাইদাস এলাকায়।

উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এই পানি শোধনাগার প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে তিনটি ধাপে। পদ্মা ও মহানন্দা নদীর মোহনায় নির্মাণ করা হচ্ছে ইনটেক পয়েন্ট। এর কাছেই গড়ে উঠছে দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি শোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন মূল ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। আর নগরীর পাশে পবা উপজেলার হরিপুর এলাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বুস্টার প্লান্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবগুলো অংশের কাজই এগিয়ে চলছে পরিকল্পনা অনুযায়ী।

রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘সর্বমোট মিলে ১৮০০ প্লাস শ্রমিক কাজ করছে। ১৮০০ প্লাস শ্রমিক প্রতিদিন কাজ করছে। কাজের গতি খুবই ভালো, দৃশ্যমান। আমাদের কাজের ফিজিক্যাল পার্সেন্টেজ অলমোস্ট ৫০ শতাংশ হয়ে গেছে। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

আরও পড়ুন:

মূল প্লান্ট থেকে বুস্টার প্লান্ট পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রান্সমিশন লাইনের মধ্যে ২০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আর নগরবাসীর কাছে পানি পৌঁছে দিতে ১৬ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন লাইন বসানো হয়েছে। চলতি মাসেই আরও ১০ কিলোমিটার লাইন স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মো. পারভেজ মামুদ বলেন, ‘আগামী ২০৩৫ এর জন্য মহানগরে যে পানির চাহিদা থাকবে সেটাকে বিবেচনায় রেখে আমরা প্লান্টের ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করেছি। ২৬.৫ কিলোমিটারের মধ্যে অলরেডি আমরা ২১ কিলোমিটার পাইপ বসিয়ে ফেলেছি।’

চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা নদীর ইনটেক পয়েন্ট এলাকায় বছরজুড়েই অন্তত ৩০ ফুট গভীরতায় পানি পাওয়া যাবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে প্রতিদিন ২০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। আর আধুনিক চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার পানির গুণগত মান ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

রুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল ওয়াকিল বলেন, ‘আমাদের বারিন্দ ট্র্যাকে পানির সমস্যা আছে। আমাদের দিন দিন গ্রাউন্ড ওয়াটারের লেভেল দিন দিন নেমে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা পুরোপুরি গ্রাউন্ড ওয়াটারের ওপরে ডিপেন্ডেন্ট, আমাদের খাবার পানিতে শুরু করে গৃহস্থালির সবকিছুতেই। এই কারণে এটা যদি অনেক আগে করতে পারতো আমাদের জন্য ভালো হতো এবং অবশ্য বর্তমানে যে কাজটা করছে পদ্মার পানি ট্রিটমেন্ট করে তারা শহরে নিয়ে আসবেন। এটা একটা বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে তাদের।’

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ এই প্রকল্পের অগ্রগতিতে আশাবাদী রাজশাহীর নাগরিক সমাজও। তাদের প্রত্যাশা, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজশাহী অঞ্চলের অবকাঠামো, সেবা খাত ও বাণিজ্যিক উন্নয়নে আরও বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে।

রাজশাহীর এসিডি উন্নয়ন বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল বলেন, ‘ওয়াসা যে কাজটি করছে, এটি এখনো দৃশ্যমান না সাধারণ নাগরিকের কাছে। এটি যখন দৃশ্যমান হবে, আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে রাজশাহীবাসী তথা এ অঞ্চলের মানুষ দারুণভাবে উপকৃত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, রাজশাহীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে আমাদের যে বৈদেশিক যে সহায়তা, বন্ধু সুলভ যে সহায়তা, এই জায়গায় আসলে আমরা অনেকটা পিছিয়ে।’

সুজন সভাপতি সফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের যে বিশাল সম্ভাবনা, সেটা হচ্ছে ভূমি। আর একদল মেধাবী তরুণ প্রজন্ম, তার সঙ্গে অতীতের কৃষকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। এর সঙ্গে যদি শুধু সরকারি সদিচ্ছা যোগ হয় এবং তাৎক্ষণিক স্বার্থ চিন্তা না করে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়া হয়, কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। আমার তো মনে হয়, সারা দেশের মধ্যে এ অঞ্চলের চেহারা পাল্টে যাবে।’

চার হাজার ৬২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প শেষ হলে রাজশাহী ওয়াসার পানি সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। একইসঙ্গে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।

এসএস