‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস’—বক্তব্যের অডিও ফাঁস, ওসিকে প্রত্যাহার

প্রত্যাহার করা ওসি আবুল হাশেম
প্রত্যাহার করা ওসি আবুল হাশেম | ছবি: এখন টিভি
0

পাহাড়ি সীমান্ত থানা নেত্রকোণার কলমাকান্দায় এক অডিও রেকর্ড ফাঁসের ঘটনায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাশেমকে প্রত্যাহার করেছে জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই অডিওতে ওসিকে বলতে শোনা যায়— ‘পুলিশের চাকরি ওয়ান কাইন্ড অব বিজনেস’। ওসির এমন বক্তব্য ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সীমান্ত চোরকারবারি রুট হিসেবে দেশজুরে পরিচিত কলমাকান্দায় এ ঘটনায় কাদের মদদ রয়েছে— এ নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

জানা যায়, আজ (রোববার, ৩১ মে) সকাল থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রায় ৪ মিনিট ৪ সেকেন্ডের একটি অডিওতে পুলিশের ভাগ বাটোয়ারাসহ নানা খোলামেলা আলোচনা উঠে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই অডিও রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, ‘পুলিশের চাকরি এক ধরনের ব্যবসা। সীমান্ত এলাকার চাকরি মূলত ব্যবসার মতো। এ ধরনের এলাকায় দায়িত্ব পালন করতে হলে সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে চলতে হবে।’

কথোপকথনে অধনস্ত পুলিশ সদস্যদের প্রতি কড়া নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়, মাথার ওপর দিয়ে বা তাকে পাশ কাটিয়ে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা না করার।

অডিওতে শোনা যায়— তিনি আর্থিক লেনদেন ও টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও খোলামেলা আলোচনায় অধস্তনদের আশ্বস্থ করে বলেন, ‘কাউকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না।’

তিনি কারও হক নষ্ট করতে চান না এবং অন্যের অধিকার হরণ করা ইসলামসম্মত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হক মারা আমি পছন্দ করি না। কারণ যারা হক মারে, রাসূল তারে শাফায়াত করবে না। এটা কিন্তু ফাইনাল কথা। যে যেখানেই আছেন, চালাকি করবেন না।’

একই সঙ্গে গোপনে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণ না করার বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি একটি মামলার উদাহরণ টেনে অধস্তনদের সতর্ক করে দেয়া হয়।

আরও পড়ুন:

কথোপকথনের আরেক অংশে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেন, তার কর্মকাণ্ডে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সন্তুষ্ট। সেখানে ‘স্যার’ তার প্রতি খুশি বলেও উল্লেখ করা হয়।

অডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ছোটখাটো আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো তিনি নিজেই সামাল দিচ্ছেন এবং এ নিয়ে অধস্তনদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।

তবে ওসি আবুল হাশেম বলেন, ‘এই অডিও বা কথোপকথনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি দাবি করেন, আধুনিক প্রযুক্তি (এআই বা ডিফেক) ব্যবহার করে কে বা কারা এটি তৈরি করেছে।’

এসময় তিনি অভিযোগ করেন, অবৈধ কোনো সুবিধা না দেয়ায় একটি কুচক্রী মহল তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে।

পুলিশ সুপার মো তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘অপেশাদার সুলভ বক্তব্য শোনার পর তাকে ক্লোজ করা হয়েছে। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) হাফিজুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আপাতত ক্লোজ থাকবে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

উল্লেখ্য, মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার তিন থেকে চারটি ইউনিয়ন একেবারে সীমান্ত এলাকায়। যে কারণে মাদকসহ সব চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে এই উপজেলা, যা কোনোভাবেই থামছে না।

রাজনৈতিকসহ সব ধরনের ব্যক্তিবর্গরা এসব চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় মাঝেমধ্যে চোরাচালানের জিনিসপত্র বা বহনকারী ধরা পড়লেও মূল ব্যবসায়ীরা সবসময় অধরাই। পতিত সরকারের সময় থেকে এখন পর্যন্ত এসব মাদক ও চোরাকারবারির মূল হোতারা বড় বড় পদ-পদবিতে থাকায় তাদের নাম পর্যন্ত কেউ মুখে নিতে চান না।

এসএইচ