শীর্ষ আদালতের দুই বিচারপতিকে বরখাস্ত ঘিরে পোল্যান্ডে অস্থিরতা, রাজপথে পুলিশ

সাংবিধানিক আদালতের সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভকারীদের জটলার মধ্যে দাঙ্গা পুলিশের সামনে সন্তান কোলে এক নারী
সাংবিধানিক আদালতের সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভকারীদের জটলার মধ্যে দাঙ্গা পুলিশের সামনে সন্তান কোলে এক নারী | ছবি: আল জাজিরা
0

পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের মধ্যপন্থি সরকার এবং জাতীয়তাবাদী বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। সংকট চরম আকার নেয়ায় রাজধানী ওয়ারশতে আদালত ভবনের সামনে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আদালত ভবনে পুলিশের প্রবেশ ঠেকাতে শুক্রবার রাতে শত শত বিক্ষোভকারী সেখানে সমবেত হন। বর্তমান পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থনে নির্বাচিত বিচারপতিরা ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট বোগদান শভিয়েতশকোভস্কি ও তার ডেপুটি বার্তলোমিয়ে সোখানস্কিকে বরখাস্ত করার পর এ উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এ সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উগ্র ডানপন্থি বিরোধী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস (পিআইএস)। আদালতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েনের জেরে পিআইএসের মিত্র হিসেবে পরিচিত পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নাভরোকি সেনেগাল সফর মাঝপথে বাতিল করেন। শুক্রবার মাঝআকাশ থেকে তার বিমান ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। আদালত চত্বরে প্রবেশের চেষ্টার সময় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

প্রধানমন্ত্রী টাস্কের দাবি, পিআইএসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধারে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

দেশটির সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল মূলত কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা নির্ধারণ করে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে যেকোনো আইনের কার্যকারিতা আটকে যেতে পারে। ফলে এ আদালতের স্বাধীনতা এবং বিচারকদের নিয়োগ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

২০১৫ সালে টাস্কের দল সিভিক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকে কট্টর ডানপন্থি পিআইএসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এ বিরোধের সূত্রপাত হয়। তখন বিদায়ি পার্লামেন্ট পাঁচজন বিচারক নির্বাচিত করেছিল। তবে আদালত পরে জানায়, মাত্র তিনটি নিয়োগের বৈধ ভিত্তি ছিল। পরে ক্ষমতাসীন পিআইএস সব কটি পদেই নতুন বিচারক নিয়োগ দেয় এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে দুদা বৈধ তিন বিচারককে শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানান।

টানা আট বছর ক্ষমতায় থাকাকালে পিআইএস বিচার ব্যবস্থায় এমন কিছু পরিবর্তন আনে, যার মাধ্যমে আদালত রাজনৈতিক প্রভাবে চলে যায় বলে অভিযোগ বিরোধীদের। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত ২০২১ সালে এক রায়ে জানিয়েছিল, অনিয়ম করে নিয়োগ পাওয়া বিচারকের উপস্থিতির কারণে একটি প্রতিষ্ঠান আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ আদালত জানায়, ট্রাইব্যুনালটি স্বাধীন আদালতের মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফের প্রধানমন্ত্রী হন টাস্ক। এরপর থেকেই তার সরকার বিদ্যমান কাঠামোর ট্রাইব্যুনালকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তাদের রায় অগ্রাহ্য করার চেষ্টা চালায়।

চলতি বছর পার্লামেন্ট ১৫ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে আটজন বিচারক নির্বাচিত করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট নাভরোকি গত বছর নির্বাচিত হওয়ার পর তিন বিচারককে শপথ পাঠ করালেও বাকি পাঁচজনকে শপথ দেননি। ওই পাঁচজন প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতেই শপথ নেন। তবে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট বোগদান শভিয়েতশকোভস্কি তাদের বিচারিক কাজ শুরুর অনুমতি দেননি।

সর্বশেষ শুক্রবার বিচারক আনা কোরভিন-পিওত্রভস্কা আদালতের প্রেসিডেন্ট শভিয়েতশকোভস্কি ও তার ডেপুটি সোখানস্কিকে এক মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করে নিজেই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেন। তবে সামগ্রিক বিচারিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি এ দায়িত্ব দাবি করায় তার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে বিচারমন্ত্রী ও প্রসিকিউটর জেনারেল ভালদেমার জুরেক বরখাস্ত হওয়া দুই বিচারপতির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

এদিকে পিআইএসের জ্যেষ্ঠ নেতারাও শুক্রবার আদালতের বাইরে এসে বরখাস্তের আদেশের প্রতিবাদ জানান। প্রেসিডেন্ট নাভরোকি দেশে ফিরে রাতেই আদালত প্রাঙ্গণে যান এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জোরপূর্বক দখলের শামিল বলে উল্লেখ করেন। তবে টাস্কের দাবি, পিআইএসের রেখে যাওয়া অচল অবস্থা কাটাতে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অপরিহার্য ছিল। আগামী বছর সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

এএম