আজ (সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ডাইভারসিফিকেশন স্ট্র্যাটেজি: প্রোডাক্ট অ্যান্ড মার্কেট ডাইভারসিফিকেশন অ্যাক্রস ১৮ কি ট্রেডিং ডেস্টিনেশনস’ শীর্ষক কর্মশালায় এ উদ্যোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, প্রতিটি বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির বর্তমান অংশ, সম্ভাবনাময় পণ্য, প্রধান প্রতিযোগী দেশ, বাজারে প্রবেশের বাধা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত উদ্যোগ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো বাজার ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে রপ্তানির পরিসর বিস্তৃত করা।
বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি কাঠামোতে এ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাত থেকেই এসেছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ পোশাকের বাইরে অন্য সব পণ্য মিলিয়ে রপ্তানি আয়ের অংশ এখনো ২০ শতাংশের নিচে।
তবে পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাতে সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলছে। গত অর্থবছরে প্রকৌশলপণ্য রপ্তানি ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ কোটি ২১ লাখ ডলারে। ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, আয় হয়েছে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। এছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে এসেছে ১২২ কোটি ৬২ লাখ ডলার এবং পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে ৮৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার।
আরও পড়ুন:
এসব খাতে প্রবৃদ্ধি থাকলেও তৈরি পোশাকের তুলনায় রপ্তানির ভিত্তি এখনো অনেক ছোট। ফলে নতুন বাজারে নতুন পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো ছাড়া রপ্তানির ওপর পোশাকনির্ভরতা কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের তাগিদ আরও বেড়েছে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সূচির কারণে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। এরপর বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ও এলডিসি-নির্দিষ্ট সহায়তা ধাপে ধাপে কমে আসতে পারে। ইউএনসিটিএডির মডেলভিত্তিক প্রক্ষেপণেও বাণিজ্যসুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশভিত্তিক রপ্তানি কৌশলের গুরুত্ব বাড়ছে। কারণ সব বাজারে একই ধরনের পণ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা না করে, প্রতিটি দেশের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য নির্বাচন করা সম্ভব হবে। কোনো বাজারে ওষুধ ও কৃষিপণ্যের সুযোগ বেশি থাকতে পারে, আবার অন্য কোনো বাজারে ইলেকট্রনিকস, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশলপণ্য কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি সেবার চাহিদা বেশি হতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর মূল্য, মান, শুল্ক ও সরবরাহ সময় বিশ্লেষণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রকৃত সক্ষমতা ও দুর্বলতাও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
তবে শুধু সম্ভাবনাময় পণ্য ও বাজার চিহ্নিত করলেই রপ্তানি বাড়বে না। আন্তর্জাতিক সনদ ও মান নিশ্চিত করা, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বন্দরসেবা, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:
আইএমএফও বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে অবকাঠামো, ঋণপ্রাপ্তি, দক্ষতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এদিকে, সরকারি বিবরণীতে এখনো নির্বাচিত ১৮টি দেশের নাম, কৌশল চূড়ান্ত করার সময়সীমা কিংবা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপের সূচক প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর পরবর্তী কর্মপরিকল্পনার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি বাজারের জন্য আলাদা পণ্যভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা, সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকা, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার উদ্যোগ এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনায় রূপ নিতে পারলে পোশাকনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে রপ্তানি কাঠামোয় বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।
অন্যথায় ১৮টি বাজার নিয়ে পরিকল্পনা কর্মশালা ও প্রতিবেদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বর্তমান পোশাকনির্ভর কাঠামো বদলানো কঠিন হবে।





