বহর সম্প্রসারণে বিপুল বিনিয়োগ—প্রবৃদ্ধির সুযোগ, নাকি ব্যয়ের নতুন চাপ?

বিমান
বিমান | ছবি: এখন টিভি
0

উড়োজাহাজের বহর বাড়ানোই কি বিমানের ব্যবসায়িক সাফল্যের নিশ্চয়তা? বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে বিপুল বিনিয়োগে উড়োজাহাজ কেনার পরও রয়েছে কিস্তি, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, বড় অংকের এই বিনিয়োগে কি বিমানের টেকসই হবে?

আকাশপথে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ছে, বাড়ছে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদাও। সেই বাস্তবতায় বহর আধুনিক করতে বোয়িং ও এয়ারবাসের নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিলে আরও ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি হয়। সব মিলিয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টি। এর জন্য ব্যয় হবে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ইউরোপীয় জাহাজ প্রস্তুত প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস থেকে ১০ টি বিমান কিনছে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।

তবে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই আয় বাড়বে এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাণিজ্যিক সফলতার জন্য দরকার রুটভেদে যাত্রীসংখ্যা , ভাড়া, ফ্রিকুয়েন্সি এবং অপারেটিং কস্ট এসব হিসেব কষতে হবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওহিদুল আলম বলেন, ‘এই এয়ারক্রাফটের পেছনে যে ইনভেস্টমেন্ট আমরা করব, সেই ইনভেস্টমেন্ট কীভাবে উঠে আসবে এটার একটা প্রপার স্টাডি করতে হয়, সার্ভে করতে হয় এবং সেটা সাধারণত যারা এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারার্স আছে তারাই কিন্তু এই রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের প্রপোজিশনটা তারা তৈরি করে দেয়। এই এয়ারক্রাফটগুলো এবার অর্ডার দেয়া হয়েছে, তখন এই রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট প্লাস মার্কেট সার্ভে এগুলো করা হয়েছে কি না আমার জানা নেই।’

উড়োজাহাজ কেনার পর শুধু কিস্তি পরিশোধই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, জনবল ও অন্যান্য ব্যয়ও। ফলে প্রশ্ন উঠছে বিমানের বর্তমান ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও আর্থিক বাস্তবতায় এত বড় বহর সম্প্রসারণ কতটা টেকসই হবে?

আরও পড়ুন:

অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকারি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বরং বেসরকারি খাতকে আরও বেশি উৎসাহিত করা উচিত ছিলো। কেননা এখন অন্যান্য যে সমস্ত এয়ারলাইনগুলো আছে তাদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠার জায়গায় নেই, এমনকি বিমানের টিকিট ভাড়া বেশি—এ ধরনের জিনিসগুলো আসলে বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিলো। নতুন করে আবার বোয়িং এবং এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি করাটি আমরা মনে করি যে অনেক আগে আসলে ঘোড়ার আগে গাড়ি টানার মতো, কেননা আমরা আসলে পুরোপুরি প্রস্তুতও না এই ধরনের নতুন বিমানগুলো পরিষেবা নেবার জন্য।’

এই বিনিয়োগের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়, ঋণের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সুফল কতটা নিশ্চিত সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

তিনি বলেন, ‘এগুলো কেনার জন্য দেখা যাবে যে সরকারের হাতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ না থাকলে সরকার যেটি করবেন, তখন আবারও নতুন করে ঋণ করবেন। দুর্ভাগ্যবশত বৈদেশিক দাতা সংস্থাগুলো এমনকি মাল্টিলেটারেল এজেন্সিগুলোর কাছে এগুলো কেনার জন্য আবার ঋণ পাওয়া যাবে। এটিই হচ্ছে এখানে একটা দুর্ভাগ্য যে তারা এগুলোর জন্য তারা ঋণ দিতে আসবেন। আমরা মনে করি যে দাতা সংস্থাগুলোরও সতর্ক হওয়া দরকার। এই ধরনের উচ্চ সুদের ঋণ নেয়া এবং এগুলো এই ধরনের পারপাসে ব্যবহার করাটি এই মুহূর্তের প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য একটা বড় আর্থিক বোঝা হবে।’

দক্ষতার সঙ্গে বহর পরিচালনা করে আয় ও যাত্রী বাড়ানো যাচ্ছে কিনা সেটিই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে বিমান বাংলাদেশের বিপুল এই বিনিয়োগের সফলতা।

এফএস