যদি কোনো কারণে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পারও হয়ে যায়, তবুও টিকা নেওয়া বাদ দেওয়া উচিত নয়। দেরি হলেও দ্রুততম সময়ে ক্ষত পরিষ্কার করে ডাক্তারের পরামর্শে টিকা দেওয়া জরুরি। উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর জলাতঙ্ক (Rabies) প্রায় ১০০% প্রাণঘাতী রোগ হলেও, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে তা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আরও পড়ুন:
কোন কোন প্রাণী থেকে জলাতঙ্ক ছড়ায়? (Rabies Carrier Animals)
জলাতঙ্কের ভাইরাস মূলত আক্রান্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর লালার মাধ্যমে ছড়ায়। এসব প্রাণীর তালিকায় রয়েছে:
- গৃহপালিত ও আশপাশের প্রাণী: কুকুর, বিড়াল, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, ঘোড়া ও গাধা।
- বন্য ও অন্যান্য প্রাণী: শেয়াল, নেকড়ে, বানর, বেজি, বাদুড় ও শূকর।
তবে প্রাণী কামড়েছে বা আঁচড়েছে মানেই যে সেটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত, তা নয়। প্রাণীর আচরণ, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং ক্ষত বা আক্রমণের ধরন বিবেচনা করে চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক।
কামড় বা আঁচড়ের প্রথম ১৫ মিনিটে জরুরি করণীয় (Immediate First Aid)
প্রাণীর আক্রমণের শিকার হলে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই ক্ষতস্থানের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:
- ১৫ মিনিট সাবান-পানি দিয়ে ধোয়া (Wash Wound for 15 Minutes): সময় নষ্ট না করে ক্ষতস্থানটি দ্রুত ক্ষারযুক্ত সাবান এবং প্রবাহমান পরিষ্কার পানির ধারে অন্তত ১৫ মিনিট ধরে ধুতে হবে। এতে ক্ষতে থাকা ভাইরাসের মাত্রা অনেকটাই কমে যায়।
- অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার (Apply Antiseptic): ধোয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পোভিডোন-আয়োডিন (Povidone-Iodine) বা অ্যালকোহলযুক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে।
- যেসব ভুল করা যাবে না: ক্ষতের ওপর মাটি, কয়লা, মরিচ, তেল, চুন বা ঘরোয়া কোনো উপাদান দেওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। ক্ষত গভীর হলে সেলাই বা শক্ত বাঁধন না দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
আরও পড়ুন:
কখন জলাতঙ্কের টিকা ও ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG) প্রয়োজন? (Vaccine and RIG Need)
সংস্পর্শের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়:
অক্ষত চামড়ায় স্পর্শ বা লেহন: চামড়া অক্ষত থাকলে এবং প্রাণী স্পর্শ করলে বা লেহন করলে সাধারণত টিকার প্রয়োজন হয় না। তবে সন্দেহ থাকলে ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া ভালো।
আঁচড় বা সামান্য ছাল উঠে যাওয়া: রক্তপাত না হলেও আঁচড় লাগলে ক্ষত পরিষ্কার করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা নিতে হবে।
চামড়া ভেদ করে কামড় বা গুরুতর ক্ষত: চামড়া ভেদ করে কামড়, গভীর আঁচড়, ক্ষতস্থানে লালা লাগা কিংবা মুখমণ্ডল ও মাথার কাছাকাছি আঘাত হলে জরুরিভিত্তিতে টিকার পাশাপাশি র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG - Rabies Immunoglobulin) দিতে হয়। এটি দ্রুত ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা গঠন করে।
আরও পড়ুন:
ক্ষতের মাত্রা ও টিকার সূচি (Exposure Categories and Vaccine Dosage)
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী ক্ষতের তীব্রতাকে ৩টি ভাগে ভাগ করে চিকিৎসা দেওয়া হয়:
- ক্যাটাগরি-১ (Category I): অক্ষত চামড়ায় প্রাণীর স্পর্শ বা চাট দেওয়া। এতে টিকার প্রয়োজন নেই।
- ক্যাটাগরি-২ (Category II): রক্তপাতহীন আঁচড় বা চামড়া সামান্য ছিলে যাওয়া। এর জন্য দ্রুত সাবান-পানিতে ধুয়ে সম্পূর্ণ কোর্সের জলাতঙ্ক টিকা (Rabies Vaccine) নিতে হবে।
- ক্যাটাগরি-৩ (Category III): চামড়া ভেদ করে কামড়, গভীর ক্ষত, রক্তপাত বা ক্ষতস্থানে লালা লাগা। এক্ষেত্রে টিকার পাশাপাশি ক্ষতের চারপাশে র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (RIG - Rabies Immunoglobulin) ইনজেকশন দিতে হবে।
টিকার ডোজ, শিশু ও গর্ভবতী নারীদের নিরাপত্তা (Dose and Safety Rules)
- টিকার ডোজ ও বুস্টার নিয়ম: টিকার নির্দিষ্ট ডোজ বা দিন নিজে থেকে ঠিক না করে ডাক্তার বা পোস্ট-এক্সপোজার সেন্টারের নির্দেশ অনুসরণ করা উচিত। পূর্বে জলাতঙ্কের পূর্ণাঙ্গ টিকা দেওয়া থাকলে নতুন কামড়ের ক্ষেত্রে ডাক্তার সাধারণত বুস্টার ডোজ নির্ধারণ করেন।
- শিশু ও গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান কিংবা অল্প বয়সের কারণে জলাতঙ্কের মূল চিকিৎসা বন্ধ রাখা যাবে না। শিশু, গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদানকারী মায়েরা নিরাপদে এ টিকা নিতে পারেন।
উপসর্গ প্রকাশের অপেক্ষা না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া, ক্ষত পরিষ্কার রাখা এবং সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ করাই জলাতঙ্ক থেকে বাঁচার একমাত্র সমাধান।
টিকার ডোজ ও সময়সূচি (Vaccine Dose Schedule):
সাধারণত ইনট্রাডার্মাল (চামড়ার নিচে) বা ইনট্রামাসকুলার (পেশিতে) নিয়মে ০, ৩, ৭ এবং ১৪/২৮তম দিনে টিকার ডোজ দেওয়া হয়। পূর্বে টিকা নেওয়া থাকলে নতুন কামড়ে চিকিৎসকের পরামর্শে শুধু ১ বা ২ টি বুস্টার ডোজই যথেষ্ট। শিশু, প্রবীণ ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও এই টিকা পুরোপুরি নিরাপদ।
আরও পড়ুন:
আরও পড়ুন:





