মানুষের হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও রক্তে যেভাবে ঢুকছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক?

ব্রেইন ও হৃদপিণ্ডে স্থান নিচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, কীভাবে বাঁচবেন?
ব্রেইন ও হৃদপিণ্ডে স্থান নিচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, কীভাবে বাঁচবেন? | ছবি: এখন টিভি
0

প্লাস্টিক দূষণ (Plastic Pollution) এখন আর কেবল জলবায়ু বা পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে মানবদেহের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে (Health Risk) রূপ নিয়েছে। প্রতিদিনের খাবার, পানীয়, ব্যবহৃত টুথপেস্ট এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা-মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastics) ও নন্যানোফাইবার মানবদেহে প্রবেশ করছে।

সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত গবেষণায় গবেষকরা মানুষের রক্ত, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এবং মাতৃস্তন্যের দুধেও (Breast Milk) এসব ক্ষতিকর কণার উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ডেইলি মেইল ও বেকার হার্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের (Baker Heart and Diabetes Institute) প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে (Microplastics in Human Body)।

আরও পড়ুন:

মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক কী? (What are Microplastics and Nanoplastics)

প্লাস্টিকের বড় বর্জ্যগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ভেঙে ভেঙে অতি সূক্ষ্ম কণায় পরিণত হয়:

  • মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastics): যেসব প্লাস্টিক কণার আকার ১ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত।
  • ন্যানোপ্লাস্টিক (Nanoplastics): ১ মাইক্রোমিটারেরও কম ছোট কণা, যা খালি চোখে বা সাধারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রেও দেখা অসম্ভব।

এসব অদৃশ্য ক্ষুদ্র কণা সমুদ্রের পানি, নদীর তলদেশ, বাতাস, খাদ্যের উৎস এবং শিশুদের ব্যবহৃত টুথপেস্টের (Children Toothpaste) মধ্যেও শনাক্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

মানবদেহে প্রবেশ ও হৃদরোগের মারাত্মক ঝুঁকি (Entry Route and Heart Attack Risk)

খাবার পাত্র, বোতলজাত পানি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং প্লাস্টিক মোড়ক থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি পাকস্থলীতে এবং বাতাসের ধুলাবালি থেকে ফুসফুসে পৌঁছে যাচ্ছে।

  • হৃদপিণ্ডের ক্ষতি: গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিককে শরীরের রোগপ্রতিরোধকারী নিউট্রোফিল কোষ বহিরাগত শত্রু হিসেবে আক্রমণ করে। কিন্তু এগুলো ক্ষয় করতে না পেরে সুস্থ কোষ ও প্রোটিন নষ্ট করে ফেলে।
  • রক্তনালীর প্রদাহ: রক্তনালীর ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে চর্বি জমে ধমনী ব্লক হতে পারে, যা সরাসরি হার্ট অ্যাটাক (Heart Attack), স্ট্রোক (Stroke) ও হৃদরোগের ঝুঁকি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  • অন্যান্য লক্ষণ: হরমোন কার্যক্রমে বাধা, স্থায়ী ক্লান্তি, কাশি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন:

মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি থেকে বাঁচার ৮ উপায় (8 Ways to Reduce Microplastic Exposure)

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন এনে প্লাস্টিকের প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব:

১. ধাতব/কাচের পাত্র: প্লাস্টিক বোতল বা পাত্রের বদলে স্টিল বা কাচের বোতল ও বাসনে খাবার ও পানি রাখুন।

২. মাইক্রোওয়েভ এড়ানো: প্লাস্টিকের টিফিন বক্সে খাবার রেখে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করবেন না।

৩. প্রাকৃতিক পোশাক: নাইলন বা পলিয়েস্টার কাপড়ের বদলে সুতি (Cotton), লিনেন ও উলের তৈরি পোশাক পরুন।

৪. চপিং বোর্ড পরিবর্তন: প্লাস্টিক কাটিং বোর্ডের বদলে কাঠের বা কাচের চপিং বোর্ড ব্যবহার করুন।

৫. চা ও পানির কাপ: ডিসপোজেবল প্লাস্টিক বা কাগজের কাপ এবং প্লাস্টিক টি-ব্যাগ এড়িয়ে চলুন।

৬. প্রসেসড ফুড কমানো: প্যাকেটজাত ও প্লাস্টিক মোড়ানো রিফাইন ফুড খাওয়া হ্রাস করুন।

৭. ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: ধুলাবালি মুক্ত রাখতে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করুন।

৮. নিরাপদ টুথপেস্ট নির্বাচন: শিশুদের জন্য প্লাস্টিকমুক্ত অর্গানিক টুথপেস্ট বেছে নিন।

মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব সংকেত। পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি নিজের ও পরিবারের সুস্থতায় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোই একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।

আরও পড়ুন:

খাদ্য নাকি বাতাস? মানুষের রক্ত ও মস্তিষ্কে যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে অদৃশ্যে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক

একনজরে মানবদেহে অদৃশ্যে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক, এর মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকি এবং সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় টিপস

বিষয় / ক্যাটাগরি বিস্তারিত তথ্য ও স্বাস্থ্য নির্দেশিকা

প্রবেশের মাধ্যম
(Sources & Entry Routes)

খাদ্য ও পানীয়: বোতলজাত পানি, প্রসেসড ফুড, প্লাস্টিক পাত্র ও টুথপেস্টের মাধ্যমে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে।

বাতাস: বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সরাসরি ফুসফুসে পৌঁছায়।

দেহের প্রভাবিত অঙ্গ
(Affected Organs)

• কণাগুলো সংবহনতন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি রক্ত, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস এবং মাতৃস্তন্যের দুধে ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও লক্ষণ
(Health Risks & Symptoms)

মারাত্মক ঝুঁকি: রক্তনালীতে প্রদাহ, চর্বি জমা, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা।

উপসর্গ: দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও স্নায়বিক জটিলতা।

সুরক্ষা ও প্রতিরোধের উপায়
(Prevention & Safety Tips)

• কাচ/মেটালের পাত্র ও বোতল ব্যবহার করা।

• প্লাস্টিক পাত্রে ওভেনে খাবার গরম করা ও প্লাস্টিকের চপিং বোর্ড এড়ানো।

• টি-ব্যাগ ও ডিসপোজেবল প্লাস্টিক কাপের বদলে নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়া।

আরও পড়ুন:

মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষতি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি (Microplastics in human body health risk), মানবদেহে প্লাস্টিকের প্রভাব (effects of plastic pollution in human blood and heart), টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক (microplastics in toothpaste BD), ন্যানোপ্লাস্টিক কী (what is nanoplastics and microplastics), হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি (microplastics causing heart attack and stroke), মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচার উপায় (how to avoid microplastic exposure)

এসআর