ইরান সংকট: হরমুজ প্রণালি ঘিরে হিসাব-নিকাশ, অস্বস্তিতে উপসাগরীয় দেশগুলো

তেহরানে মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে পথচারীরা হাঁটছেন
তেহরানে মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে পথচারীরা হাঁটছেন | ছবি: রয়টার্স
0

ইরান যুদ্ধ ছয় মাসে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যয়বহুল অচলাবস্থায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর ইরান অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়লেও দেশটির সরকার টিকে আছে এবং সময় তাদের পক্ষে আছে—এমনটাই মনে করছে তেহরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য বলা হয়েছে।

রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও কড়া নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছেন। তবে বড় প্রশ্ন হলো—ইরানের অর্থনীতি সচল রাখতে যেসব দেশ ভূমিকা রাখছে, তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কি ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ কঠোরভাবে কার্যকর করবে। রয়টার্সের ভাষ্যে, তেহরানের ধারণা—চীন ও ভারতসহ এসব দেশের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন শেষ ধাপের কঠোর প্রয়োগে যাবে না।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন পদক্ষেপগুলো ঘোষণা করেছে, তাতে সংঘাতের কেন্দ্র মিসাইল-হামলা থেকে সরিয়ে ইরানের তেল রাজস্ব, ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা অর্থনৈতিক জীবনরেখা বন্ধ করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নৌ-অবরোধ ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ সীমিত করছে বলে রয়টার্স উল্লেখ করেছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্টের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। বেসেন্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে অভিযানের উল্লেখ করলেও মিলারের মন্তব্য, ‘এটা ডি-ডে নয়; এটা ডেসপেরেশন ডে।’

নিউ ইয়র্কভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটস বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার চেয়ে নৌ-অবরোধই বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, ইরানের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করা নয়, বরং এই চাপ থেকে বের হওয়ার উপায় খোঁজা। তিনি বলেন, চাপ বাড়লে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে সংঘাতকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে, যাতে ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথে ফিরতে বাধ্য হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে নাইটসের বক্তব্যের সূত্রে বলা হয়েছে, ইরান লোহিত সাগরে হুথিদের কৌশলের মতো পথে যেতে পারে—মাঝেমধ্যে হামলা, মাঝেমধ্যে আলোচনা, আর দীর্ঘদিন ধরে বিঘ্ন তৈরি।

তবে ওয়াশিংটন বলছে, ক্ষমতার ভার তাদের দিকেই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেছেন, ইরানের অর্থনীতি দ্রুত নিচের দিকে যাচ্ছে এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা বড় ধাক্কা খেয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে সব তাস আছে এবং আমরা সরকারের হাতে থাকা প্রতিটি আর্থিক জীবনরেখা বন্ধ করে দিচ্ছি।’

অন্যদিকে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক অ্যালান আয়ার রয়টার্সকে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সমর্থন ও প্রশাসনিক সক্ষমতা আছে কি না—সেটি প্রশ্ন। তার মতে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির আগে যে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল, এবার তার বদলে প্রকাশ্য হুমকির ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, চীনের মতো দেশগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করবে না—এটাই তেহরানের ধারণা। ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে পারে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেশের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি করা। তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ ব্যর্থ হয়েছিল এবং এবারও ব্যর্থ হবে বলে তার দাবি।

রয়টার্স লিখেছে, ইরানের নেতৃত্বের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়তে বাড়তে আবার বড় ধরনের বিক্ষোভে রূপ নেয়া। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৬৬ শতাংশে। ভোক্তা মূল্যসূচক এক বছর আগের তুলনায় ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি ছিল। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ১২৮ শতাংশ।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গত সপ্তাহে বলেছেন, ‘আমাদের সমস্যা কয়েক গুণ বেড়েছে, আর আয় কমেছে।’ রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক কষ্ট ঘিরে বিক্ষোভ দমনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর ও বাসিজির ভূমিকার কথাও এসেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে হোসেইন তায়েবকে বাসিজির নেতৃত্বে নিয়োগকে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্যও হিসাব জটিল বলে রয়টার্স লিখেছে। তারা আরেক দফা যুদ্ধ চায় না, কিন্তু এমন কোনো ফলও চায় না, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন তৈরি করার সক্ষমতা ধরে রেখে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে পারে। সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেছেন, ইরানের আচরণ দ্রুত বদলাতে নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট কি না—এ নিয়ে উপসাগরীয় সরকারগুলোর সন্দেহ আছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চায় হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের ‘লিভারেজ’ শেষ করতে, তবে তেহরানকে প্রণালি ব্যবস্থাপনায় কোনো ভূমিকা দিতে রাজি নয়। ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া হোক, কিন্তু সেটা যেন আত্মসমর্পণ হিসেবে না দেখা হয়। আর উপসাগরীয় দেশগুলো চায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে থাকুক, তবে ইরানকে বিজয়ী অবস্থানে যেতে না দিয়ে।

এএম