‘স্বপ্নের আমেরিকা’ থেকে দেশে ফিরছে রাজুর নিথর দেহ

আবদুল আহাদ রাজু (বামে), বন্দুকধারী (ডানে)
আবদুল আহাদ রাজু (বামে), বন্দুকধারী (ডানে) | ছবি: সংগৃহীত
0

পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে প্রায় তিন বছর আগে পাড়ি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। স্বপ্ন ছিল একদিন বৈধ কাগজপত্র হাতে নিয়ে স্ত্রী-সন্তানদেরও আমেরিকায় নিয়ে আসবেন। নিজের একটি স্থায়ী ঘর করবেন, দুই মেয়েকে সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারালেন নোয়াখালীর আবদুল আহাদ রাজু। এবার স্বপ্নের আমেরিকা থেকে শেষবারের মতো দেশে ফিরছেন তিনি।

৪৪ বছর বয়সী রাজুর মরদেহ শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। এর আগে বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের বাংলাদেশ মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে তার নামাজে জানাজা। মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি।

গত ২৩ আগস্ট মধ্যরাতের পর ব্রুকলিনের ৮৪২ রকঅ্যাওয়ে অ্যাভিনিউয়ের আমেরিকানস বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজ্জা রেস্টুরেন্টে গুলির ঘটনায় গুরুতর আহত হন রাজু। ওই রেস্টুরেন্টেই কর্মরত ছিলেন তিনি। পরে তাকে দ্রুত ব্রুকডেল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল মেডিকেল সেন্টারে নেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

একই ঘটনায় তার বাংলাদেশি সহকর্মী রাসেলও গুলিবিদ্ধ হন। তার পায়ে গুলি লাগে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন এবং সুস্থ আছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন:

রাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাশে দাঁড়িয়েছে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি। বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, মানবিক বিবেচনায় রাজুর মরদেহ দেশে পাঠানো, জানাজা ও ফিউনারেলের বিভিন্ন খরচ কমিউনিটির সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো বহন করছে। এজন্য যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে, তা রাজুর পরিবারের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক সহায়তা দিচ্ছে নিউ ইয়র্কের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ড্রাম। সংগঠনটির কর্মকর্তা কাজি ফৌজিয়া জানান, বাংলাদেশে রাজুর স্ত্রী হোসনে আরা আকতার পলির সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে।

রাজুর রেখে যাওয়া পরিবারে এখন শুধু শোক নয়, সামনে অনিশ্চয়তার দীর্ঘ পথ। তার দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স ১২ বছর। ছোট মেয়ে রাইসার বয়স মাত্র আড়াই বছর। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কিছুদিন পরই রাইসার জন্ম হয়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের ছোট মেয়েটিকে দেখার সুযোগই হয়নি রাজুর।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামের সন্তান রাজু প্রায় তিন বছর আগে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর বৈধভাবে থাকার আশায় অ্যাসাইলামের আবেদন করেছিলেন। তার সাক্ষাৎকারের তারিখও নির্ধারিত ছিল ২০২৮ সালে।

আরও পড়ুন:

অর্থাৎ সামনে ছিল আরও অপেক্ষা। স্বপ্ন ছিল, একদিন বৈধ কাগজপত্র হাতে পাবেন। তারপর স্ত্রী ও সন্তানদের যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসে নতুন করে জীবন শুরু করবেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার আর কোনো শেষ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় ঋণ করেছিলেন রাজু। পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ঘর নির্মাণের স্বপ্নও ছিল তার। নিজের পরিবারকে একটু স্বচ্ছল জীবনে ফেরানোর সেই চেষ্টা শেষ হলো একটি গুলির ঘটনায়।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এখন স্ত্রী ও দুই সন্তানকে সামনে নিয়ে এগোতে হবে। বাবার অপেক্ষায় থাকা আড়াই বছরের রাইসা হয়তো কোনোদিনই জানতে পারবে না, কেন তার বাবা আর দেশে ফিরে আসছেন না।

এদিকে, রাজু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট (এনওয়াইপিডি)। সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে তাকে গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য ছবি প্রকাশ করেছে পুলিশ। ঘটনার কারণ ও পুরো প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রাজুর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে একটি গোফান্ডমি অ্যাকাউন্টও খোলা হয়েছে। এতে বিভিন্ন মহল থেকে সাড়া মিলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এসএস