হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা; আরামকো ও এডনকের জাহাজে হামলা

হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা জাহাজ
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা জাহাজ | ছবি: রয়টার্স
0

ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকাল নৌ-অবরোধ বজায় রাখতে পারবে এবং তেহরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হবে বলে গতকাল (বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট) জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অচলাবস্থা, বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা এলো। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরানের ওপর জারি করা নৌ-অবরোধ কার্যকর রাখতে অঞ্চলটিতে নৌ উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর রয়েছে। এই অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানামা সফরকালে হেগসেথ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অনির্দিষ্টকাল ধরে এই ধরনের অবরোধ বজায় রাখতে পারবে। কারণ আমরা যেভাবে জাহাজ পালাক্রমে মোতায়েন করে আসছি, সেভাবেই তা চালিয়ে যাব।’

আরও অর্থনৈতিক চাপের ইঙ্গিত
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও বেশি অর্থনৈতিক আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে। নিউজম্যাক্সের ‘রব শ্মিট টুনাইট’ অনুষ্ঠানে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে আরও বেশ কিছু ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় থাকুন। কারণ কোনো দেশের ওপর অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসে যা দেখা যায়নি, আমরা তেমন ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে যাচ্ছি।’

গত জুনে যুদ্ধ অবসানে হওয়া প্রাথমিক চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় ওয়াশিংটনের ওপর পাল্টা চাপ প্রয়োগ করতে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণকে হাতিয়ার করেছে ইরান। এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা কিছু জাহাজে হামলাও চালিয়েছে দেশটি। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হতো।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ওয়াম’ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রণালি অতিক্রমকালে রাষ্ট্রায়ত্ত আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডনক) দুটি জাহাজে হামলা চালানো হয়। আমিরাত সরকার এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একে ইরানের হামলা হিসেবে অভিহিত করেছে।

ট্রাম্পের ওপর ঘরোয়া চাপ
জ্বালানির উচ্চ দাম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনসমর্থনের হার কমিয়ে দিচ্ছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে তার দলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে অজনপ্রিয় এই যুদ্ধ অবসানের জন্য দেশের ভেতর থেকেই চাপে রয়েছেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে। যদিও ইরান এই দাবি অস্বীকার করে আসছে। তেহরান জানিয়েছে, তাদের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই জলপথ পুনরায় খুলে দেয়া হবে না। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ থাকা ইরানি সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া। মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮টিতে। গত ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১২টি এবং যুদ্ধের আগে দিনে ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলাচল করত।

গত জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জাহাজ চলাচল ও বন্দরের ওপর জারি করা অবরোধ এক মাসের জন্য তুলে নিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে তা পুনর্বহাল করে। এতে তেহরানের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধকালে জ্বালানি অবকাঠামোয় চালানো হামলার আগের ক্ষতিও এতে আরও বেড়েছে। ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালির দুই পাশে অবস্থিত হওয়ায় এই দুই দেশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের চুক্তিতে পৌঁছানোর পর অবরোধ তুলে নেয়ার কথা এর আগে জানিয়েছিল ওয়াশিংটন।

তেল সরবরাহে সংকট
সেনাবাহিনী মোতায়েন করে হামলা আরও বাড়ানো এবং ‘ইরানকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করার’ হুমকিও বারবার দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এখন পর্যন্ত তিনি স্থল সেনা মোতায়েন, কৌশলগত দ্বীপ দখল কিংবা পানি শোধন কেন্দ্রে বোমাবর্ষণে বিরত রয়েছেন। এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক পদক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক উপায়ের ওপরই তিনি বেশি নির্ভর করবেন।

ইরান ও অস্ত্র সরবরাহে সহায়তাকারী হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর করেছে। তবে এই চাপ প্রচারণা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বুধবার পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক ৪৩ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৪ শতাংশ কমে যাবে। মাত্র এক মাস আগে সংস্থাটি ৩৭ লাখ ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিল।

এক সপ্তাহ বাড়তির পর বৃহস্পতিবার তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি কমেছে। বৈশ্বিক চাহিদা কমার লক্ষণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের নজর সেদিকেই ছিল। তবে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতিরা সৌদি আরামকোর একটি শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে সামনে আসা প্রতিবেদন বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এতে আঞ্চলিক যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা নতুন করে দেখা দিয়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস, এই যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধস নামবে এবং কিছু অঞ্চল মন্দার দিকে যেতে পারে। তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, দ্রুত যুদ্ধ শেষ না হলে এর প্রভাব আরও বাড়বে। গত এপ্রিলে ইরানে উচ্চ-গতির বোমাবর্ষণ বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করাটা কি ভুল ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ বলেন, ‘আমি কখনোই এই বিষয়ে মন্তব্য করব না। ইরান যাতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা যা প্রয়োজন ঠিক তা-ই করছি।’

এএম