গত শুক্রবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেন। এতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে কোনো সাধারণ হুমকির কথা উল্লেখ করিনি।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর ওপর যারা হামলা চালাবে না, তাদের কখনোই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।
ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর ধাঁচে চুক্তি
ফিদান জানান, প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই চুক্তি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ন্যাটোর এই ধারা অনুযায়ী, এক সদস্যের ওপর হামলা সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে বাস্তবে জবাব কেমন হবে, তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। আক্রান্ত দেশকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ জানাতে হবে এবং তারা কী ধরনের সহায়তা চাইছে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে হবে। এই সহায়তা গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক, গোলাবারুদ থেকে শুরু করে সেনাদল মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে।
এই জোটের অধীনে রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটি গঠন করা হবে। এতে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সামরিক প্রধানরা অংশ নেবেন। সৌদি আরবে থাকবে এর একটি স্থায়ী সচিবালয়। তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, লজিস্টিক ও সামরিক আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা নিয়ে কাজ করবে। এই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হতে পারে প্রতিরক্ষা শিল্প খাতে সহযোগিতা। ফিদান জানান, মক্কার বৈঠকে তিন নেতা এই বিষয়টি নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। এই চুক্তির প্রস্তুতি প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে চলছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ফলে এটি ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে হুট করে তৈরি করা হয়েছে বলে যে ধারণা রয়েছে, তা নাকচ করে দেন তুর্কি মন্ত্রী।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
আঙ্কারার আশ্বাস সত্ত্বেও এই চুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ইরানের কিছু কর্মকর্তা। তুরস্ক ও পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করে সৌদি আরব নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না বলে সতর্কও করেছেন তারা। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিশনের সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি নেতাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না। কমিশনের আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি এই চুক্তিকে ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে সরাসরি এই চুক্তির কথা উল্লেখ না করলেও আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভর করতে এবং ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতির ওপরও জোর দেন।
জোটে ঢুকতে পারে মিসর
ফিদান জানান, এই অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব আঞ্চলিক দেশগুলোর কাঁধেই তুলে নেয়ার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ এই চুক্তি। তিনি বলেন, ‘বাইরের শক্তির অঞ্চলটিতে আসা সমস্যার সমাধান করে না, বরং তা আরও তীব্র করে তোলে।’ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে এই উদ্যোগের ‘মূল দেশ’ হিসেবে অভিহিত করে এই জোটকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ফিদানের ভাষায়, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, আমাদের তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনে সব দেশকে এই ছাতার নিচে আনা যেতে পারে।’ তিনি জানান, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। মিসরকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, কারিগরি বিষয়গুলো মিটে গেলেই তারা এই জোটে যোগ দেবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে সংকটের সময়ে তিন দেশের সেনাবাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সেসহ ব্যবহারিক অনেক দিকই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে পরিকল্পিত কমিটি, স্থায়ী সচিবালয় এবং প্রতিরক্ষা শিল্প খাতে সহযোগিতার বিষয়গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই চুক্তি একটি সাধারণ প্রতিরক্ষা ঘোষণার চেয়েও অনেক বেশি কিছুতে রূপ নিতে যাচ্ছে।





