হরমুজ ও লোহিত সাগরে উত্তেজনা; জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা জাহাজ
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা জাহাজ | ছবি: রয়টার্স
0

হরমুজ প্রণালি থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা দুটি জাহাজকে থামানোর দাবি করেছে ইরান। এর পরপরই গতকাল (শুক্রবার, ৩১ জুলাই) বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে ভূমধ্যসাগরের একটি মিসরীয় বন্দরে জাহাজে ড্রোন হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে উদ্বেগ ছড়িয়েছিল, ইরানের এই পদক্ষেপ তাকে আরও ঘনীভূত করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইরান দাবি করেছে, তাদের বাহিনীর হস্তক্ষেপে আরও চারটি ট্যাংকার পথ পাল্টাতে বাধ্য হয়েছে। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যমের এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তেল সরবরাহ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগর থেকে তেল বোঝাই করা দুটি বড় ট্যাংকার এবং অন্য দুটি পণ্যবাহী জাহাজকে ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত এই সরু জলপথটি পার হতে দেখা গেছে। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে অবশ্য এই তথ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সাধারণত এই প্রণালি দিয়েই বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাতের শুরু থেকেই ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচলে বাধা দিচ্ছে। এর মিত্র ইয়েমেনের হুতিরাও চলতি মাসে সৌদি অপরিশোধিত তেল রপ্তানির অন্য পথ বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলার হুমকি দিয়ে আসছে। এই প্রণালিটি সুয়েজ খালের অন্য প্রান্তে লোহিত সাগরে অবস্থিত।

শুক্রবার তেলের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরানের এই দাবির কারণেই তেলের দামে এই উল্লম্ফন। এর আগে এই সপ্তাহে এমন আরেকটি খবর ছড়ালেও তার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। রয়টার্সের করা এক জরিপে অংশ নেয়া অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলতি বছরে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। জুলাই মাসে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পথে রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ইরাকে ইরান-সমর্থিত বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যরাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নতুন হামলার খবর পাওয়া যায়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেয়া এক বিবৃতিতে জানান, যুদ্ধ ভালোভাবেই চলছে। তিনি বলেন, ‘জিততে থাকা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে। শেষ পর্যন্ত কিছু একটা হবেই।’ তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। পরে ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনো মনে করেন ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

তবে ইরানিদের ওপর থেকে তার আস্থা কমছে বলেও জানান ট্রাম্প। তার ভাষায়, ‘তারা প্রায়ই কথার বরখেলাপ করে’। যদিও তেহরান প্রায়ই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করে থাকে। ট্রাম্প এ-ও বলেন, তিনি ইরানকে ‘আঘাত করে যাবেন’।

ইরানের নিয়ন্ত্রণ

হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানের গঠিত একটি সংস্থা শুক্রবার জানিয়েছে, এই অঞ্চলে ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী পদক্ষেপ চলতে থাকায়’ এই প্রণালি অতিক্রম করা এখনো অসম্ভব। ইরানি সংবাদমাধ্যম এই তথ্য জানিয়েছে। কিছু জাহাজ তেহরানের সঙ্গে দর-কষাকষির মাধ্যমে প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছে।

পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি জানিয়েছে, স্থিতিশীলতা ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেই সব আবেদন পর্যালোচনা করে ধীরে ধীরে ট্রানজিট পারমিট দেয়া হবে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, উপসাগর দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি ঠেকাতে মার্কিন বাহিনী নৌ অবরোধ অব্যাহত রেখেছে এবং তারা সফলভাবে ভারী মাত্রার একটি হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে শুক্রবার তারা কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের কেশম দ্বীপে একটি বাড়িতে হামলার জবাবে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলেও দাবি ইরানের। এই দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির কাছেই অবস্থিত, যেখান থেকে ইরান জাহাজ চলাচলে হামলা শুরু করেছিল।

কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা হামলাকারী ড্রোনগুলো ধ্বংস করেছে। ধ্বংসাবশেষ পড়ে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ বিষয়ে বাহরাইনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তেলের দাম আরও বাড়বে: রয়টার্স জরিপ

ইরান ও তার মিত্র হুতিরা হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালালেও, লোহিত সাগর হয়ে সৌদি জ্বালানি রপ্তানির জন্য সুয়েজ খাল ও সুমেদ পাইপলাইন এখনো নিরাপদ উত্তরমুখী পথ হিসেবে চালু রয়েছে।

মিসরের মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরীয় দামিয়েতা বন্দরে অজ্ঞাত এক ড্রোন হামলায় দুটি জাহাজে আগুন লেগেছে। এই বন্দরটি সুয়েজ খাল থেকে সড়কপথে ১৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। ইরান দামিয়েতার হামলার সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এই অঞ্চলে মিসর আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু ও অংশীদার এবং তাদের নিরাপত্তা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট করার লক্ষ্যে চালানো ইসরাইলি ষড়যন্ত্র ও ফলস-ফ্ল্যাগ অপারেশনের বিষয়ে আমাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ আরাঘচির এই অভিযোগের বিষয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে রয়টার্স মন্তব্য চাইলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সৌদির নেতৃত্বে বহুজাতিক জোটের প্রস্তাব

গত ২০ জুলাই ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করেছে। ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে এটি একটি নতুন মোর্চা খুলেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার লন্ডনের সামুদ্রিক বীমা বাজার লোহিত সাগরের ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকার পরিধি বাড়িয়েছে। এতে সৌদি বন্দরগুলোর কাছাকাছি আরও বেশি উপকূলীয় এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

লোহিত সাগর অঞ্চলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহের পথ সুরক্ষিত রাখতে বৃহস্পতিবার একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সৌদি আরব। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ সৌদি তেল ও অন্যান্য জাহাজ এখন লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল এবং সুমেদ পাইপলাইনের দিকে সরে যাচ্ছে। তবে এশীয় ক্রেতাদের জন্য এর মানে হলো, তাদের এখন আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে জড়িত সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সমর্থিত হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার একটি পরিকল্পনা ওমান ইরানকে দিয়েছে। এই পরিকল্পনায় প্রণালি ব্যবহারের জন্য স্বেচ্ছায় ফি দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ইরান প্রকাশ্যে ওমানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএলএনএ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে।

এএম