মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় গত মাসে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন। চলতি সপ্তাহে এই আন্দোলন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য তরুণদের দিক থেকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার নয়াদিল্লির রাস্তায় নেমে আসেন কয়েক হাজার তরুণ বিক্ষোভকারী। এ সময় তাদের পিছু হটাতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটা করে পুলিশ।
বুধবার নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী সাংসদেরা জড়ো হন। তাদের অনেকে কালো পোশাকে শিক্ষামন্ত্রী প্রধানের পদত্যাগ দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করেন। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বিক্রির জন্য নয়’ এবং ‘জীবন বাঁচান, নিট বন্ধ করুন।’ নিট হলো মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টের সংক্ষিপ্ত রূপ। এ সময় তারা মোদি ও প্রধানের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন।
পার্লামেন্টের ভেতরে ঢুকে বিরোধী সাংসদেরা শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি সহিংসতা এবং প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা নিয়ে বিতর্কের দাবি জানান। এতে অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি করতে বাধ্য হয় স্পিকার। মোদি ও প্রধান জানিয়েছেন, তারা এই ইস্যু এবং বৃহত্তর শিক্ষা সংস্কার নিয়ে বিতর্কে প্রস্তুত।
মঙ্গলবার রাহুল গান্ধীর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস মোদির বাসভবনের প্রবেশপথের সামনে ধরনা শুরু করে। বিক্ষোভ শেষ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় রাহুল গান্ধী, তার বোন প্রিয়াঙ্কা ভদ্রসহ বিরোধী দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে আটক করে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
একাধিক শহরে বিক্ষোভ
স্ব-ঘোষিত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই বিক্ষোভ প্রথমে অনলাইনে ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল। প্রথম দিকে মাত্র কয়েকশ তরুণ এতে অংশ নেন। কিন্তু বুধবার দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির প্রতিবাদস্থলে এক হাজারের বেশি বিক্ষোভকারী জড়ো হন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা ভারতের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে স্লোগান দেন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির নেতারা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীর সঙ্গে সোমবারের পর দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসার কথা রয়েছে।
রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন কেন্দ্রীয় এলাকার ১৬টি স্টেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিক্ষোভ রাজধানী ছাড়িয়ে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, গোয়া, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরম, জম্মু ও আহমেদাবাদেও ছড়িয়ে পড়েছে।
পদত্যাগের দাবি ওঠার পর মঙ্গলবার রাতে প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন শিক্ষামন্ত্রী প্রধান। তিনি জানান, বিক্ষোভরত তরুণদের উদ্বেগ ও পরীক্ষা সংস্কারের বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমাদের সরকার সংসদের ফ্লোরে নিট এবং তরুণদের প্রতিটি প্রকৃত উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ রাহুল গান্ধীর বিক্ষোভের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার চেয়ে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’
৫৭ বছর বয়সী প্রধান মোদির দল বিজেপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা এবং তাকে দলের উদীয়মান নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অতীতে বিজেপির নেতৃত্ব দেয়ার জন্যও তার নাম শোনা গিয়েছিল। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধান একজন মন্ত্রী। তিনি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস, ইস্পাত, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালে তিনি শিক্ষামন্ত্রী হন। তার বাবাও বিজেপির প্রবীণ নেতা ছিলেন এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধানের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে মোদি ও বিজেপি কোনো সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলে তার গুরুত্বের ইঙ্গিত দেয়। সিজেপির জনপ্রিয়তার এই উত্থান ভারতের তরুণদের চাকরি সংকট ও ঘন ঘন প্রশ্ন ফাঁসের মতো ইস্যুতে হতাশা প্রতিফলিত করে। বিরোধী দলগুলোকেও মোদি ও তার বিজেপির ওপর চাপ প্রয়োগের বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে এই আন্দোলন। তরুণ ভোটারদের নিজেদের মূল ভিত্তি হিসেবে গণ্য করে বিজেপি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে চমকপ্রদ ফলাফলের পর থেকে দলটি একের পর এক রাজ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। ওই নির্বাচনে মোদি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি।
সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে সিজেপি আন্দোলন গতি পায়। তিনি গত ২৮ জুন অনশন শুরু করেছিলেন। শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক হাসপাতালে সরিয়ে নেয়। মঙ্গলবার তার স্ত্রীর করা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের আদেশের পর তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ওই আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছিল, তাকে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিএস লম্বার্ডের প্রধান ভারত অর্থনীতিবিদ শুমিতা দেবেশ্বর বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন এই বিক্ষোভ মোদি সরকারের জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ, এটি চাকরি খুঁজতে হিমশিম খাওয়া তরুণ ও ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির মধ্যে এক গভীর ক্ষোভে আঘাত করেছে।’
 hold placards-768x402.webp)




