এনআইডি সংশোধনে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য; ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

এনআইডি সংশোধন
এনআইডি সংশোধন | ছবি : এখন টিভি
0

এনআইডি সংশোধনে ইসি কর্মকর্তাদের চেয়েও বেশি ভরসা যেন বিশ্বস্ত দালালচক্রে। ভুক্তভোগীদের দাবি, মাসের পর মাস এনআইডির ভোগান্তির থেকেই অনেকটা বাধ্য হয়েই দালালের শরণাপন্ন হতে হয়। এসব চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকেই হাজার হাজার টাকা খুইয়েছেন। বড় ধরনের সংশোধনীতে চাওয়া হয় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। ভোগান্তির কথা স্বীকার করে ইসি সচিব বলছেন, অনেকেই ভুল তথ্য দেয়ায় সার্বিকভাবে বেগ পেতে হচ্ছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র দ্রুততম সময়ে সংশোধন করতে অনেকের কাছে দালালচক্রই যেন ভরসা। বিষয়টি শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবতা এর চেয়েও ভয়ানক। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা নির্বাচন অফিস ঘুরে সেবা প্রত্যাশীদের শেষ ঠিকানা ইসি সচিবালয়। তবে এখানে এসে অনেককেই পড়তে হচ্ছে প্রতারকের ফাঁদে। এনআইডি সংশোধনে অনলাইন-অফলাইনে হরেকরকমের আয়োজন থাকলেও বাস্তবতা অসহনীয় বলছে সেবাপ্রত্যাশীরা। প্রমাণপত্র থাকার পরও অপেক্ষা মাস পেরিয়ে বছরে।

এ সুযোগটাই নিচ্ছে বেশকিছু দালাল চক্র। ইসি সচিবালয়ে এনআইডি সংশোধনের নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছানোর আগেই কয়েক স্তরের অফারের প্রস্তাব মেলে। নির্বাচন ভবন, ইটিআই ভবনের আশপাশের সড়ক ধরে হাঁটতেই সক্রিয় বেশ কয়েকটি দালালচক্র। দ্রুত সময়ে এনআইডি সংশোধনের লোভে সাড়াও দিচ্ছেন কেউ কেউ।

সেবাপ্রত্যাশীরা জানান, তারা চান দ্রুত যেন তাদের কাজ হয়ে যায়। বেশি টাকা দিয়ে হলেই তাড়াতাড়ি তারার তাদের কাজ শেষ করতে চান।

কথা হয় বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে। ৭ দিনের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস পেয়ে কেউ কেউ খুইয়েছেন ৫০ হাজার টাকার বেশি। আরও দ্রুত সংশোধন চাইলে টাকার অংক আরেকটু বেশি, তবে ১ লাখ টাকার কম নয়।

ভুক্তভোগীর একজন বলেন, ‘এ সেকশনে আমার যে চাচাতো ভাই আছে, চাচাতো ভাইয়ের থেকে নিছে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা ‘

আরও কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো- বিশ্বস্ত দালালের খোঁজে তারাও। একজনের দেয়া ঠিকানা ধরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সামনের সড়কে গিয়ে মিললো একটি চক্রের সন্ধান। অভিযোগ ফাউন্ডেশনের কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত এ চক্রে।

আরও পড়ুন:

চক্রের সদস্যদের একজন বলেন, ‘ফাউন্ডেশন থেকে অনেকেই কাজ করত। আমার ফাউন্ডেশনের। ভিতরে গিয়ে আগে পরিচয় নিবেন যে চাকরি করে কিনা।’

নির্বাচন ভবনকেন্দ্রীক আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন রাস্তা ধরে এগোতেই খোঁজ মেলে চক্রের আরও সদস্যের। পরিচয় গোপন করে সেবা নেয়ার আগ্রহ জানাতেই এনআইডি সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যা গ্যারান্টি সহকারে সমাধানের আশ্বাস দিলেন, জানা গেল খরচাপাতির হিসাবও। সার্টিফিকেট থাকা সাপেক্ষে নাম ও বয়সের সংশোধনী চাওয়া হলো ৮০ হাজার। ১০ থেকে ১৫ বারের প্রত্যাখ্যাত আবেদন কিংবা বড় জটিলতার সংশোধনের ফি ২ লাখ টাকা। জানালেন নির্বাচন ভবনে আছেন তাদের নিজেদের লোক।

দালালচক্রের একজন বলেন, ‘ফিঙ্গার হওয়ার আগে এক টাকাও দেয়া লাগবে না। ফিঙ্গার হওয়ার পরে পুরো টাকা দিবেন। আমি আপনাকে সঙ্গে নিয়ে যাব, সঙ্গে নিয়ে কার্ড দেবেন, অনলাইনে চেক করবেন, সমস্যা নাই।’

অভিযোগ আছে ইসি সচিবালয়কেন্দ্রিক কয়েকটি কম্পিউটার দোকান থেকে চলে দালালদের নেটওয়ার্কিং। যারা মাঠ পর্যায় থেকে ভুক্তভোগীদের টার্গেট করেন।

নির্বাচন ভবনের আশপাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠা এনআইডি সেবা সংশ্লিষ্ট ভ্রমমাণ দোকানপাট উচ্ছেদে শেরেবাংলা থানাকে দায়িত্ব দেয়া হলেও নেই কার্যকর উদ্যোগ। মাঝেমাঝে লোকদেখানো অভিযান চললেও নেই সুফল। তবে পুলিশ বলছে- নিয়মিতই অভিযান চালানো হয়।

শেরেবাংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তায় চলছে, প্রায় অভিযান চালায়। আবার বসে, আবার এখানে আবার বসে। কতক্ষণ খেয়াল রাখা যায়। চেষ্টা করি সবসময় তো চেষ্টা করি, এখন অনেক সময় দেখা যায় যে অজান্তে বসে পড়ে, পরে আমরা অ্যাকশন নেই।’

এনআইডি সংশোধনে কিছু ভোগান্তির কথা স্বীকার করলেন ইসি সচিব। তবে বেশিরভাগ আবেদনকারীই ভুল তথ্য উপস্থাপন করায় বেগ পেতে হয় বলে দাবি তার।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘সামান্য আকার, ইকার, রসিকার, দীর্ঘিকার এগুলো এগুলো করণিক ত্রুটি। এগুলোকে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে যতটুকু যত দ্রুততার সঙ্গে করে দেয়া সম্ভব, করে দেয়া হয়। আমার যে সক্ষমতা আছে, ম্যানপাওয়ারের যে সক্ষমতা আছে, আমি ডিসপোজাল করতে পারি ১০০টি। আমার যদি ১ হাজার অ্যাপ্লিকেশন প্রত্যেক দিন আসে, তাহলে ৯০০টি তো পেন্ডিং থাকবেই।’

জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স সংশোধনীতে কেউ কেউ ১৮ থেকে ২০ বছর কমানোর আবেদন করলেও মাঠ পর্যায়ে সত্যতা পায়নি ইসি।

এফএস