ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুর বাজার। স্থানীয়দের নিত্য আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত এ বাজার থেকেই গেল ৪ জুলাই সন্ধ্যায় দুর্বৃত্তরা অপহরণ করে ১১ বছরের এক শিশুকে। ধর্ষণের পর মেয়েটিকে ফেলে যাওয়া হয় পুকুরে; তখনও প্রাণ ছিল ছোট্ট শরীরে।
এ ঘটনায় স্তম্ভিত বারুইপুরবাসীর মধ্যে রয়েছে শিশুটির ৪৬ বছর বয়সী বাবা। নিখোঁজের একদিন পর ৫ জুলাই ভোরে মেয়ের নিথর দেহ যখন পুকুরের ময়লার স্তূপ থেকে টেনে তোলা হচ্ছিল, নিজের চোখেই দেখেছিলেন আদরের মেয়ের শরীরজুড়ে পৈশাচিকতার ক্ষত স্পষ্ট।
ভুক্তভোগীর বাবা বলেন, আমার সন্তান যে স্কুলে পড়ত, তার আশপাশে তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি যেন বাচ্চারা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে। অন্য কোনো মাকে যেন আমাদের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।
এ ধরনের ঘটনার কথা আমরা আগে শুধু শুনেছি, কিন্তু নিজেরা কখনো দেখিনি, আর এখন এখানেই ঘটে গেলো এমন ঘটনা। চরম ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় একটা ঘটনার সাক্ষী হলাম।
ভারতজুড়ে যৌন সহিংসতার সবশেষ উদাহরণ বারুইপুরের ঘটনা। দেশটিতে প্রতিদিন পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় কমপক্ষে ৮০টি ধর্ষণের ঘটনা, তথ্য জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর। ভুক্তভোগীকেই উল্টো দোষারোপ আর মানহানির প্রবণতা সমাজে বিদ্যমান বলে আরও অনেক ঘটনা পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় না, অভিযোগ অধিকারকর্মীদের। তাদের মতে, সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতা ও নারীবিদ্বেষের গভীর শেকড়, পুলিশে জনবল সংকট, বিচারপ্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাস্তি ছাড়াই অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠছেন তারা।
নয়া দিল্লির সেন্টার ফর সোশ্যাল রিসার্চের পরিচালক রঞ্জনা কুমারী বলেন, সমাজের বড় অংশ যে বার্তাটি পাচ্ছে, তা হলো- এটা অপরাধ হলেও এমন কোনো গুরুতর অপরাধ নয় যে এজন্য কেউ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পাবে। অন্যদিকে, সমাজ নিজেই নারীর মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তাই নারীর মর্যাদা লঙ্ঘন খুব সহজ এবং এতে কারও কিছু যায় আসে না।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যে বারুইপুরের ঘটনায় সমালোচনায় বিদ্ধ ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। নির্বাচনের আগে রাজ্যটিতে নারীদের সুরক্ষা ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দলটির সর্বপ্রথম প্রতিশ্রুতি। তবে অধিকারকর্মীরা বলছেন, পুরুষতান্ত্রিকতা আর বর্ণবৈষম্যের বিষে জর্জরিত সারা দেশে পুলিশ, প্রশাসন আর বিচার বিভাগে লিঙ্গ-নিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল প্রশাসকের অভাব প্রকট বলে সরকার বদলালেও বদলাচ্ছে না সমাজ।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অধিকারকর্মী শতাব্দী দাস বলেন, সরকার পরিবর্তন এ ধরনের সমস্যার সমাধান নয়। কোনো নির্দিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে নয় বরং ধর্ষণের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে আমাদের। আর ধর্ষণের এই সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে গেড়ে বসে আছে।
২০২৪ সালে ধর্ষণের প্রায় ৩০ হাজার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ভারতে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। শিশুদের যৌন সহিংসতা থেকে সুরক্ষা আইনের অধীনে দেশটিতে চলমান মামলার সংখ্যা রেকর্ড প্রায় ৭০ হাজার।





