‘শীতকালীন ফ্লুর মতোই তাপদাহকে গণ্য করুন’, ইউরোপকে ডব্লিউএইচওর সতর্কবার্তা

তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করছেন পথচারীরা
তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করছেন পথচারীরা | ছবি: সংগৃহীত
0

ইউরোপে চলতি গ্রীষ্মে তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। ভয়াবহ তাপদাহে অসুস্থতা, প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে গোটা মহাদেশে। এই পরিস্থিতিকে ‘নতুন স্বাভাবিক’ হিসেবে অভিহিত করছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপকে এখন থেকেই ‘শীতকালীন ফ্লুর মতোই’ তাপদাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা করতে হবে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে তথ্য উঠে এসেছে।

গত রোববার জার্মানি, চেক প্রজাতন্ত্র এবং পোল্যান্ডে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০৪ ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফ্রান্সে দৈনিক গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এক শহরে ৪৪ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। এই তাপদাহের কারণে ফ্রান্সে অতিরিক্ত ১ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের (ডব্লিউডব্লিউএ) মতে, এই ধরনের চরম গরম এখন ২০০৩ সালের তুলনায় শত গুণ বেশি হচ্ছে এবং ৫০ বছর আগে এটি ছিল প্রায় অকল্পনীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। কোপারনিকাসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-র দশক থেকে ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. অক্ষয় দেওরাস বলেন, ‘ব্যাপারটি অনেকটা এমন এক দৌড় প্রতিযোগিতার মতো, যার শুরুর লাইনটি সমাপ্তি লাইনের অনেক কাছাকাছি এনে রাখা হয়েছে।’ ডব্লিউডব্লিউএর মডেল বলছে, বর্তমান হারে কার্বন নিঃসরণ চলতে থাকলে চলতি গ্রীষ্মের মতো ভয়াবহ তাপদাহ প্রতি কয়েক দশক পরপর দেখা যাবে। শতাব্দীর মধ্যভাগে এটিই সাধারণ গ্রীষ্মের চেহারা হতে পারে।

এই তাপদাহের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে ‘হিট ডোম’ বা তাপকুণ্ডলীকে দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। এটি এমন একটি উচ্চচাপ বলয়, যা এক স্থানে দীর্ঘ সময়ের জন্য তাপ আটকে রাখে। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হানা ক্লক জানান, বর্তমানে যে চরম আবহাওয়ার প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তা কয়েক দশক আগে নির্গত কার্বনের ফল। জলবায়ু ব্যবস্থার এই প্রতিক্রিয়া দিতে সময় লাগে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের ৯৫ শতাংশের বেশি অঞ্চলে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল, রেকর্ড পরিমাণ আল্পস পর্বতের হিমবাহ গলেছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রাও সর্বোচ্চে পৌঁছেছে।

মানব স্বাস্থ্যের ওপর এই তাপদাহের প্রভাব ইতিমধ্যে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ল্যানসেট কাউন্টডাউন ইউরোপের হিসাবে, শুধু ২০২৪ সালেই এই অঞ্চলে গরমজনিত কারণে ৬২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডব্লিউএইচওর ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক ড. হ্যান্স ক্লুগ বলেন, ‘ইউরোপের অধিকাংশ ভবন শীতপ্রধান জলবায়ুর জন্য নির্মিত। এগুলো তাপ ধরে রাখে, বের করে দেয় না।’ পুরোনো ভবনগুলো সংস্কার না করলে ২০৫০ সালের পরেও মৃত্যুহার বাড়তেই থাকবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্থায়ী হলেও এখনও ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। ইউরোপের প্রধান নদীগুলোতে পানি সরবরাহকারী আল্পস হিমবাহ পুনরুদ্ধারের পথ পেরিয়ে গেছে। তবে অধ্যাপক ক্লক জানান, উত্তর ইউরোপের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এখনো পুনরুদ্ধার সম্ভব। বিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো—নির্গমন কমানো, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পুরনো পানির অবকাঠামো নতুন করে সাজানো। এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যতে গ্রীষ্মকালকে সহনীয় রাখতে পারে; অন্যথায় তা মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে।

এএম