বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস: জিনজিরার কারখানায় ‘পুড়ছে’ শৈশব

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ
বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ | ছবি: সংগৃহীত
0

ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরা। চারদিকে যান্ত্রিক কোলাহল আর বাতাসে ঝাঁঝালো কেমিক্যালের গন্ধ। মাথার ওপর টিনের চাল বেয়ে নামছে দুপুরের তপ্ত আঁচ, একটা ফ্যান ঘুরলেও তাতে গুমোট গরম কাটার কোনো লক্ষণ নেই। এই ‘নরক গুলজারের’ ভেতরেই শরীরময় কালি আর ঘাম মেখে বসে একমনে দুপুরের ভাত মুখে তুলছিল বারো বছরের এক কিশোর, নাম মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। সকাল থেকে একটানা হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি তার চোখে-মুখে স্পষ্ট। এই বয়সে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করার কথা; সেখানে আবদুল্লাহর দিন কাটে অ্যালুমিনিয়াম কারখানার অন্ধকার চারদেয়ালে।

আবদুল্লাহ একা নয়, জিনজিরার অলিতে-গলিতে একটু খুঁজলেই এমন অন্তত ৫০ জন শিশুর দেখা মেলে, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। কেউ কেউ তো এর চেয়েও আরও ছোট। শৈশবের কাঁচা বয়স পার হওয়ার আগেই তারা এখানে একেকজন ‘পূর্ণাঙ্গ’ শ্রমিক। দৈনিক টানা ১২ ঘণ্টা করে ঝুঁকিপূর্ণ সব কাজ করে যাচ্ছে তারা। কখনো লোহা পিটিয়ে, কখনো অ্যালুমিনিয়াম গলিয়ে, আবার কখনো বিষাক্ত রঙের কারখানায়। বড়রাও যে কাজ করতে গেলে দুবার ভাববেন, সামান্য কিছু টাকা বা সাপ্তাহিক চুক্তির বিনিময়ে এই শিশুরা তা অনায়াসেই করে চলেছে।

জিনজিরার কারখানাগুলোতে কাজ করা শিশুদের একটা বড় অংশই একসময় স্কুলে যেত। কিন্তু দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত, পরিবারের চাপ কিংবা ভাগ্যের ফেরে আজ তারা বই-খাতা ফেলে হাতুড়ি হাতে তুলে নিয়েছে। এদের অনেকে তো নিজের বয়স কত, সেটাই ঠিকঠাক জানে না।

বাগেরহাট থেকে আসা আবদুল্লাহ আগে একটি হিফজ মাদ্রাসায় পড়ত। দেড় পারা মুখস্থ করার পর পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে সে। অভাবের সংসার, তাই মা-বাও আর জোর না করে তাকে পাঠিয়ে দেন জিনজিরার এই হাড়িপাতিল তৈরির কারখানায়। আবদুল্লাহর ভাষ্য, এখন প্রতিদিন কাজ করি, যা পাই তা দিয়ে পরিবারের একটু সাহায্য হয়।

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ |ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের শাকিল পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেই নেমে পড়েছে উপার্জনের লড়াইয়ে। দর্জি দোকান আর মুদি দোকান ঘুরে তার বর্তমান ঠিকানা জিনজিরার এই ছিটকিনি তৈরির কারখানা। নিজের বয়স না জানা শাকিলের সোজাসাপ্টা কথা, ‘পড়াশোনা ভালো লাগত না, তাই কাজে ঢুকে গেছি। এখন নিজের কামাইয়ে নিজে চলি।’

অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোহাম্মদ মহসিনের গল্পটা আরও কষ্টের। গত তিন বছর ধরে সে এই এলাকায় কাজ করছে। বাবা রিকশা চালান, মা গৃহিণী আর বোন পড়াশোনা করে। বাবার একার আয়ে যখন পাঁচজনের সংসার আর চলে না, তখন মহসিন বাধ্য হয়েই কাঁধে তুলে নিয়েছে পরিবারের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার’ জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০১৯ সালে যেখানে শিশুশ্রমের হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশে। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ; এই বয়সীদের প্রায় ১৪ শতাংশই শ্রমের বাজারে যুক্ত।

শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’র আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার এই পরিস্থিতির পেছনে পারিবারিক নির্ভরতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘এই শিশুরা যা আয় করে, তার একটা বড় অংশই তাদের পরিবারের পেছনে খরচ হয়। দরিদ্র পরিবারগুলোকে যদি আমরা আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে না পারি, তবে শিশুশ্রম বন্ধ করা কঠিন।’ তিনি আরও জানান, অনেক সময় স্কুলে বিনামূল্যে বই দেয়া হলেও খাতা-কলমসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ চালাতে না পেরে কিংবা পরীক্ষায় খারাপ করলে অভিভাবকরা শিশুদের পড়া বন্ধ করে কাজে বা বিয়েতে দিয়ে দেন।

ঝুঁকিপূর্ণ এই শ্রম শিশুদের কেবল শৈশবই কেড়ে নিচ্ছে না, ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার ভবিষ্যৎ আর নিশ্চিত স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে। বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্য বলছে, এই শিশুদের ৫ শতাংশ ভারী বোঝা বয়, ৪ শতাংশ বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করে এবং ৪ শতাংশ কাজ করে প্রচণ্ড ধুলাবালি, ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে।

বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস আজ |ছবি: সংগৃহীত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এই বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বয়সে এমন কঠোর পরিশ্রম শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। রঙের কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে ঢুকে তা স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দেয়। লিভার ও কিডনির মতো সংবেদনশীল অঙ্গগুলোও এই বিষাক্ত কেমিক্যালের কারণে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

কাগজে-কলমে বাংলাদেশের শ্রম আইনে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, বাস্তবে এর চিত্র একেবারেই উল্টো। মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আইন শুধু খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। যারা আইন তৈরি করছেন, তাদের অনেকের ঘরেই শিশুশ্রমিক রয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে কেবল তৈরি পোশাক (গার্মেন্টস) খাতে শিশুশ্রম বন্ধ করা গেছে, কিন্তু দেশের বাকি সব অনানুষ্ঠানিক খাতে এটি দেদারসে চলছে।’ তার মতে, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং কঠোর আইনি সদিচ্ছা ছাড়া এটি বন্ধ করা অসম্ভব।

উন্নয়ন গবেষকদের মতে, আমাদের সমাজে শিশুশ্রমের এক ধরনের নীরব সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়ে গেছে। মালিকপক্ষ সস্তায় খাটাতে শিশুদের নিচ্ছে, আর মা-বাবাও পেটের দায়ে সন্তানকে কারখানায় পাঠাচ্ছেন।

জিনজিরার এই কালচে ধোঁয়ার আড়াল থেকে শিশুদের আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল আইনের ডান্ডা উঁচিয়ে লাভ হবে না। সরকার, সমাজ, কারখানার মালিক এবং অভিভাবকদের যৌথ সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে আবদুল্লাহ, শাকিল কিংবা মহসিনদের পিঠ থেকে শ্রমের জোয়াল নামিয়ে আবার তাদের হাতে বই-খাতা ফিরিয়ে দিতে।

এনএইচ