বর্ষার আগেই ডেঙ্গু আতঙ্ক, বাড়ছে হেমোরেজিকের ঝুঁকি

হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড
হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড | ছবি: এখন টিভি
0

বর্ষার আগেই এবার ডেঙ্গু আতঙ্ক। হেমোরেজিক ডেঙ্গুর শঙ্কায় সতর্কবার্তা দিচ্ছেন খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যেখানে রয়েছে রক্তক্ষরণে দ্রুত মৃত্যুর ঝুঁকি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, দরকার পরিকল্পিত প্রস্তুতি। মশা নিধন, সচেতনতা এবং হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।

জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর পিক মৌসুম। এবছর ডেঙ্গু মৌসুম শুরুর আগেই হামের মতো সংক্রমিত রোগ নিয়ে বিপর্যস্ত চিকিৎসা সেবা। এর মধ্যে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে ডেঙ্গু। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ৩০ জনের বেশি। আর চলতি সপ্তাহে মারা গেছে ১ জন।

গেল বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিলো ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। এর মধ্যে মারা যায় ৪১৩ জন। এবার ধারণা করা হচ্ছে গতবারের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। এ নিয়ে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে আগাম সতর্কবার্তা দিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ স্থানীয় প্রশাসন। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এরই মধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, চিকিৎসকদের আশঙ্কা অনুযায়ী এবার হেমোরেজিক ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, যেখানে রয়েছে মারাত্মক রক্তক্ষরণের ঝুঁকি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডাক্তার সাহেবরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে এবার হেমোরেজিক হতে পারে। মানে রক্তক্ষরণ হতে পারে, হুইচ ইজ ভেরি ডেঞ্জারাস ফর লাইফ।

কেন স্বাস্থ্যখাতের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন বার্তা? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কি বলছেন?

আরও পড়ুন:

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধানত চারটি ভিন্ন রূপ বা সেরোটাইপ রয়েছে - DENV-1, DENV-2, DENV-3 এবং DENV-4। কেউ যদি একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হন, তখনই দেখা দিতে পারে হেমোরেজিক জ্বরের লক্ষণ। ভয়ের শঙ্কা ঠিক এখানেই। সরকারি হিসেবে গত ৩ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫ লাখ ২৫ হাজার ২৫৪ জনের মত। এত বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ যদি আবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন তাহলে হেমোরেজিক বা রক্তক্ষরণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই অবস্থা সাধারণ ডেঙ্গুর চেয়ে অনেক বেশি গুরুতর ও প্রাণঘাতী। হেমোরেজিক রোগীর রক্তনালী থেকে প্লাজমা লিকেজ হয়ে রক্তচাপ মারাত্মকভাবে কমে যায়, শুরু হয় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ যা দ্রুত রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। সাধারণত মশার কামড়ের চার থেকে দশ দিনের মধ্যে এই লক্ষণ প্রকাশ পায়।

নবজাতক ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, যদি আপনার ডেন-১ দিয়ে হয়, এর পরবর্তীতে যদি আপনার বা টু দ্বারা হয়, আপনি পরবর্তীতে আবার থ্রি বা ফোর দ্বারা হলে, আপনার যদি আগে ডেঙ্গু হয়ে থাকে, অন্য স্ট্রেইন দ্বারা হয়—এখানে একটা ক্রস রিঅ্যাকশন হয়। যার জন্য তাদের হেমোরেজিক ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। ফার্স্ট অ্যাটাকে হবে না। যার সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ অ্যাটাক হবে, ওদেরই কিন্তু খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ওদের হেমোরেজিকটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আগের অ্যান্টিজেন, এই অ্যান্টিজেন ক্রস রিঅ্যাকশন হয়ে মানে প্লাটিলেটও কমে যায়।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেমোরেজিক ডেঙ্গু দেশে নতুন কোনো বিষয় নয়। এডিস মশা নিধন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পূর্বপ্রস্তুতির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব। একইসঙ্গে গণমাধ্যমে হেমোরেজিক ডেঙ্গু নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনাও করেন তারা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, হেমোরেজিক ডেঙ্গু যেটি, সেই ক্ষেত্রে হয় কি পুরো শরীরটা চামড়ার নিচে চাকা চাকা হয়ে যায়। দাঁতের গোড়া দিয়ে, মলদ্বার দিয়ে, মূত্রের সাথে, কাশির সাথে, বমির সাথে রক্ত আসে এবং রক্তপাতের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে রক্ত বেরিয়ে যায় এবং শরীরে কিছু জটিলতা তৈরি হয়। এ কারণেই আমরা ডেঙ্গুর চ্যালেঞ্জের প্রথম কথাটা বলব হচ্ছে এডিস মশাটা নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয় জায়গাটা আমরা বলব হচ্ছে যে—হাসপাতালগুলোকে জরুরি অবস্থার জন্য তৈরি করা। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এটি না বললেও পারতেন। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব হলে সেই ক্ষেত্রে ডেঙ্গু তো হয় শক সিন্ড্রোম বাড়বে, অথবা হেমোরেজিক ডেঙ্গু বাড়বে, অথবা ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু। তিনটিই তো আমাদের জন্য বিপদ তৈরি করে।

সেই সাথে যারা একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের এবার সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া, পরিস্থিতি বিবেচনায় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইভি ফ্লুইড ব্যবস্থাপনা এবং আইসিইউ ও এইচডিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখার উপরও জোর দেন তারা।

ইএ