২০১৮ সালের বি-৭৩৭ ও ড্যাশ-৮ বিমানের পাইলট সংকট নিরসনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। কিন্তু এই নিয়োগের আপত্তি জানিয়ে বিমানের পাইলটদের সংগঠন শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করতে চিঠি পাঠায় বিমানের কাছে।
যাতে বাপা নিজেই বাংলা মিডিয়ামের বি গ্রেড ও ইংলিশ মিডিয়ামের ডি গ্রেড কে সমমানের তুলনা করে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশ শিক্ষা বোর্ডকে ডিঙিয়ে বাপার এই চিঠির পেছনে ছিলো স্বজনপ্রীতি ও অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা।
অভিযোগ উঠে, প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনই করতে পারতেন না তৎকালীন বিমানের এমডি মুসাদ্দিক আহমেদের ভাতিজা মুক্তাদির, সাবেক এমপি শাহেদা দিপ্তীর মেয়ে মেহজাবিন মন্দিরা ও বিমানের প্রভাবশালী ক্যাপ্টেন রফিকের ছেলে জুনায়েদসহ বর্তমানে বিমানে কর্মরত অন্তত ১৩ জন পাইলট।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। যাতে উঠে আসে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল ও বিমানের অপারেশনস ম্যানুয়ালে উল্লেখিত পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ না করেই পাইলটের মতো স্পর্শকাতর পদে নিয়োগ পেয়েছেন অযোগ্য ব্যক্তিরা।
এ নিয়ে দুদকের উচ্চতর তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে তৎকালীন বিমানের এমডি মোসাদ্দিক আহমেদসহ বিমানের চার শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের ও তাদের চাকরিচ্যুত করা হলেও এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন নিয়োগকৃত পাইলটরা।
তদন্ত রিপোর্টে উঠে আসা অন্তত ৫ যোগ্য পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এখন টেলিভিশন। তারা জানান, বিগত ৮বছরে বহুবার বিমানের দ্বারস্থ হলেও কোনো সমাধানই মেলে নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পাইলট বলেন, ‘মিনিস্ট্রি ইটসেলফ অ্যান্ড দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এইটা এই নিয়োগটাতে ওনারা দুইটা বডি সেপারেটলি একটা ইনভেস্টিগেশন করেছেন। সেপারেটলি ইনভেস্টিগেশন করার পরে এই দুই বডি এই নিয়োগের ব্যাপারে কিছু গাফিলতি প্রমাণ পেয়েছে। যারা যারা জড়িত ছিলেন, যারা যারা ইভেন এখানে অ্যাপ্লাই করার মতো অবস্থায় যাদের যোগ্যতা ছিল না, তারা দিব্যি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমানে সার্ভ করছে।’
নিয়োগ বঞ্চিত পাইলট নূর মোহাম্মদ জুয়েল বলেন, ‘যেই নাম্বারটা বিমান দিয়েছে, ওটার ৭৫ শতাংশ আর ভাইভার ২৫ শতাংশ করলে দেখা যায় যে ওই লিস্ট করলে সেখানে আমরা চলে আসি। তার মানে, আমরা আসলেই লিস্টে থাকতাম, যদি ম্যানুয়াল অনুসারে করা হতো। আমাদেরকে বাদ দেয়ার জন্য জিনিসটা এভাবে ম্যানিপুলেট করা হয়েছে।’
এ ঘটনায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে নিয়োগবঞ্চিত দুইজন পাইলটকে গত বছরের ২১ জুলাই ৩০ কর্মদিবসে নিয়োগের নির্দেশ দেয় আদালত। তবে ৯ মাস অতিবাহিত হলেও আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেনি বিমান কর্তৃপক্ষ।
আইনজীবী তাহসিন মুক্তার নিশান বলেন, ‘বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের শুনানিতেও বলেছে, এ ধরনের কাজ তারা আগেও করেছে। এখন বারবার যদি এই ধরনের কর্মকাণ্ড চলতে থাকে, তাহলে দেশের যোগ্য প্রার্থীরা সবসময় বঞ্চিত হবে।’
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা বোসরা ইসলাম। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভুক্তভোগীদের মানসিকভাবে ভঙ্গুর করে দেয়ার মত এমন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে বিমান।।
অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অব বাংলাদেশের মহাসচিব গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মফিজুর রহমান বলেন, ‘শুধু বিমানের পাইলট বা উচ্চপদস্থ কারো ছেলে-মেয়েদের জন্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া ডিলে করা হয়েছে, তাদের নেয়ার জন্য আইন বদলানো হয়েছে। তো সার্বিকভাবে এই জিনিসগুলোর যে এই যে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, তারপর আপনার বিভিন্ন রকম অনিয়ম, সেগুলোর দায় বিমান তো এড়াতে পারে না।’
তবে এখন টেলিভিশনের কাছ থেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত হওয়ার পর ভুক্তভোগীদের এ ঘটনা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘ওই সময় সবকিছুই অনিয়মের মধ্যে চলছে। আমরা এখনও সমস্ত ফাইলগুলো দেখতেছি। কোনো রকমের দুর্নীতি টলারেট করা হবে না এবং বিগত দিনে যেগুলি হয়েছে সেগুলি তদন্ত সাপেক্ষে যেটা যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার সেগুলি করতে বলেছি। আমি আশ্বাস দিতে চাই, ভুক্তভোগী পাইলট যারা আছে তারা যদি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের লিখিত বক্তব্যগুলি আমাদের কাছে পেশ করে, আমরা এটা যাচাই-বাছাই করে দেখবো। যদি সত্যিকার অর্থেই তারা ভুক্তভোগী হয়ে থাকে, তাদের সমস্যাগুলি সমাধান করবো।’




