জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক গউছ মোড়ল বর্গা নিয়ে ২০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করলে তাড়াহুড়া করে ১০ বিঘা জমির ধান কেটে মাড়াই করেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে সেই ধান শুকাতে না পেরে এখন পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ধানে গজিয়েছে বড় বড় চারা। অন্যদিকে, বাকি ১০ বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে পানির নিচে। জলে-স্থলে সবকিছু হারিয়ে গউছ মোড়ল সারাবছর পরিবারের ভরন-পোষণ আর ঋণ পরিশোধের ভাবনায় পাগলপ্রায়।
গউছ মোড়ল বলেন, ‘২০ বিঘা খেত করছিলাম ঋণ-পিন কইরা। একটা ধানও ঘরে তোলতে পারিনি। অর্ধেকে নিচেগা পাইন্নে, বাকি অর্ধেক কাইট্টাও লাভ হইছে না। ১০ দিন ধইরা রইদ নাই, সব ধানে গেরা (চারা) আইছে। এই ধানগুলা আর শোকাইলেও লাভ হইত না। সারাবছর এখন কীভাবে চলমু আর মালিকরে কিতা বুঝাইমু!’
শুধু গউছ মোড়ল নন, হাওরপাড়ের প্রায় প্রতিটি কৃষকের গল্পই এখন এমন। টানা বর্ষণ আর উজানের ঢলে বিস্তীর্ণ হাওরে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও সারাবছরের পরিশ্রমের ফসল রক্ষা করতে পারেননি কৃষকরা।
গত কয়েকদিন ধরেই ঝড়-বৃষ্টি আর বজ্রপাতের ঝূঁকি মাথায় নিয়েই ধান কাটার চেষ্টা করেছেন অনেক কৃষক। কেউ কোমরপানি, কেউ বুকপানিতে নেমে ধান কেটেও শেষ রক্ষা হয়নি কষ্টের ফসলের; চোখের সামনে তলিয়ে গেছে একর পর এক জমি। এখনও হাওরের পানি প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে উঁচু জমির ধানও। পাকা ধান কাটার সুযোগ থাকলেও শ্রমিক সংকটে কাটতে পারছেন না তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে দাবি তাদের।
এদিকে গত ৮ থেকে ১০ দিন টানা বৃষ্টিতে মাড়াই করা ধান শুকাতে না পেরে বিভিন্ন এলাকায় পঁচে গেছে। বৈশাখে যেখানে মিষ্টি ধানের পাঁকা গন্ধে চারপাশ মাতোয়ারা থাকে, সেখানে এখন বাতাসে শুধু পঁচা ধানের দুর্গন্ধ। কোনো কোনো ধানের স্তূপে জন্মেছে নতুন চারা।
অন্যদিকে, হাওরের পানি প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় উঁচু জমির ধানও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না, ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে।
আরও পড়ুন:
লাখাই উপজেলার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, ‘১৪ কের খেত করছিলাম। একটা ধানও ঘরে নিতা পারছি না। কিছু গেছেগা পানির তলে, আর কিছু রইদের অভাবে নষ্ট হইয়া গেছে। এবার কৃষকের যে অবস্থা বাঁচা দায়। রেইন-পেইন নিয়ে সবাই দুশ্চিন্তায়। কী করবে-কী না, কোনো কুল-কিনারা পাইতেছে না কেউ।’
বানিয়াচংয়ের গুণই গ্রামের মশাকলি গ্রামের কৃষক সুমন দাস বলেন, ‘যে ধান কেটেছিলাম, বৃষ্টিতে শুকাতে পারিনি। সব ধানেই চারা গজিয়ে গেছে। এমন ক্ষতি জীবনে দেখিনি। পানিতেও গেছে, শুকনাতেও গেছে।’
একই এলাকার কৃষক আনন্দ দাস বলেন, ‘৫ কের ক্ষেত কাটছিলাম ২০ হাজার টাকা দিয়া। এখন সেই ধানও নষ্ট হইছে। ধানের সঙ্গে পকেট থেকে আরও লস হইলে। এখন উজানে আমার ৩ কের ক্ষেত আছি, যে অবস্থা এগুলোও আর বাঁচত না মনে হয়। প্রতিদিন পানি বাড়তেছে কিন্তু ধান কাটতে পারতেছি না। একদিকে বৃষ্টি, আরেকদিকে শ্রমিক নাই।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই অবস্থা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার দাশ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যেহেতু পানি বাড়ছে, সেহেতু ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এছাড়া ধান শুকাতে না পারায় যে ক্ষতি হচ্ছে, তার তথ্যও নিরূপন করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার কৃষকের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। প্রণোদনার জন্য সেই তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
এদিকে, সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বছর জেলায় ৭ হাজার ৯০ টন ধান এবং ১৭ হাজার ২২০ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।





