৩ কোটি মানুষের শহরে ৩৩ হাজার পুলিশ: দিনে-দুপুরে অপরাধে আতঙ্কিত ঢাকা

ঢাকা শহর ও পুলিশ | ছবি: এখন টিভি
1

রাত নয় দিনের আলোয় প্রকাশ্যে তাড়া করে করা হচ্ছে হত্যা, চাঁদাবাজি আর ছিনতাই। অথচ প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষের এ মেগাসিটি ঢাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে মাত্র ৩৩ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। পুলিশের তথ্য মতে, ঢাকা শহরের কোথাও কোথাও ৮ হাজার মানুষের জন্য কাজ করছেন একজন পুলিশ। অপরাধের তুলনায় চালু আছে সীমিত সংখ্যক টহল ব্যবস্থা।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জানান দেয় কতটা অনিরাপদ এ রাজধানী শহর। অপরাধ-সহিংসতা যেন পরিণত হয়েছে পেশায়।

বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টের তথ্যমতে, এখানে বসবাস করছে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৩৩ হাজারের মতো। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় টহল ব্যবস্থার মাত্র ১৫ শতাংশ নিশ্চিত করতে পারছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

এখন টেলিভিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে, রাজধানীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা মোহাম্মদপুর আর আদাবর থানায় বাস করে ২০ লাখ বাসিন্দা। আর এই এলাকায় কাজ করছে আড়াইশো পুলিশ। অর্থাৎ প্রতি ৮ হাজার বাসিন্দার বিপরীতে রয়েছে মাত্র একজন পুলিশ।

জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য কমপক্ষে ২২২ জন পুলিশ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখানে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য পুলিশ সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে ১০০-এর নিচে। এর মধ্যে আবার বড় একটি অংশ নিয়োজিত থাকে ভিআইপি প্রোটোকল, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে।

নাগরিকরা জানান, হঠাৎ করে কোনো অপরাধ হলে সেখানে দ্রুত পুলিশ আসে না। অনেক সময় ৯৯৯ নম্বরে কল করেও মিলছেনা সেবা।

আরও পড়ুন:

পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজিতে নাভিশ্বাস উঠেছে নগরজীবনে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে।

ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের এডিসি মো. জুয়েল রানা বলেন, ‘মোহাম্মদপুরে থানা পুলিশে মিলে ২৫০ পুলিশ আছে, লোক ২০ লাখ। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি ৮ হাজার মানুষের জন্য আমাদের একজন করে পুলিশ নিয়োজিত আছে। থাকার কথা ছিলো ৫০০ জনে একজন। তাহলে ২০ লাখ মানুষের জন্য ৪ থেকে ৫ হাজার পুলিশ লাগবে। আমার আছে ২৫০ জন। রেড স্পট আছে ক্রাইম জোনের, এরকম ৫০টি জায়গা আছে। আমি সর্বোচ্চ বললাম, ৮টি আমার টহল টিম, আমি সর্বোচ্চ অ্যাট এ বেস্ট একসঙ্গে ৮টি জায়গায় পুলিশ মোতায়েন রাখতে পারব। বাকি ৪২টি জায়গার কী হবে? স্বাভাবিকভাবেই জনগণের যে প্রত্যাশা আমাদের প্রতি সেটা পূরণ হবে না।’

ডিএমপির উপ- পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘স্বল্পসংখ্যক পুলিশ দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করা কষ্টসাধ্য। তারপরেও আমাদের ডিএমপির পুলিশ দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।’

অপরাধ বিশ্লেষকের মতে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে জনবল নিয়োগের পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। তবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কোন প্রচেষ্টাই এই বিশাল নগরীর নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে পারবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমরা যেহেতু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পুলিশের সদস্য খুব রাতারাতি বাড়াতে পারছি না, আবার এখন যেভাবে অপরাধীরা প্রযুক্তিকে পুঁজি করে অপরাধ করছে, সংখ্যা শুধু বাড়িয়েও লাভ নেই। যদি এই পুলিশের কার্যক্রমের সঙ্গে আমরা যদি প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করতে না পারি, শুধু সংখ্যা বাড়িয়ে কাজ হবে না। সরকার করতে পারে কোনো ধরনের অপরাধীকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেয়া।’

যে শহরে রুটি রুজির তাগিদে বসবাস করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা কয়েক কোটি মানুষ। সে শহর কতটুকু নিরাপদ। সংখ্যার বেড়াজালে বাধাপড়া এই স্বল্পসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই নাজুক। তাই প্রযুক্তির সক্ষমতা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মান উন্নয়নের মাধ্যমে শহরকে নিরাপদ রাখার পরামর্শ বিশ্লেষকদের।

এফএস