ফুরিয়েছে রাজধানীর দুই ল্যান্ডফিল্ডের বর্জ্য ধারণক্ষমতা, হুমকিতে প্রাণ-প্রকৃতি

ল্যান্ডফিল্ডে বর্জ্য বহনকারী ট্রাক
ল্যান্ডফিল্ডে বর্জ্য বহনকারী ট্রাক | ছবি: এখন টিভি
0

২০১৭ সালেই শেষ হয়েছে আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের ধারণক্ষমতা। তবুও ৯ বছর পেরিয়ে সেখানে থামেনি বর্জ্য ফেলা। আর রাজধানীর অন্য প্রান্তে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডে পুড়ছে প্লাস্টিক, পলিথিনসহ নানা বর্জ্য। বিষাক্ত কালো ধোঁয়া আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় বিপর্যস্ত জনজীবন। ল্যান্ডফিল্ডের অতিরিক্ত চাপ আর বিষাক্ত ধোঁয়ার দাপটে একদিকে নাজুক বায়ুমান, অন্যদিকে হুমকির মুখে প্রাণ-প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্য।

একের পর এক বর্জ্যবোঝাই গাড়ি ঢুকছে আমিনবাজার ল্যান্ডফিল্ডে। নগরীর বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লা, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন-এসটিএস হয়ে শেষ গন্তব্য এখানেই।

প্রতিদিন গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০টি গাড়ি বর্জ্য আনডোড করে আমিনবাজারে। প্রতিটিই যেন নতুন করে চাপ বাড়ায় ক্লান্ত এ ভূমির ওপর। অথচ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে ল্যান্ডফিল্ডটির ধারণক্ষমতা। সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও বাড়তি এ চাপ সামলাতে হচ্ছে ল্যান্ডফিলটিকে।

৩০ ফুট উচ্চতার সীমা ছাড়িয়ে এখন প্রায় ৯০ ফুট পর্যন্ত বর্জ্য জমে গেছে ল্যান্ডফিলটিতে। এতে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়ছে না, বরং নির্গত হচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস বিশেষ করে মিথেন, যা পরিবেশ ও জলবায়ুর জন্য মারাত্মক হুমকি।

একই চিত্র রাজধানীর অন্য প্রান্তে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ডেও। এখানে পুড়ছে প্লাস্টিক ও পলিথিনসহ নানা বর্জ্য। এতে তৈরি হচ্ছে ঘন কালো ধোঁয়া, যা ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের আবাসিক এলাকায়।

দূষণের কারণে অনেক বাসিন্দাই ঘরের জানালা পর্যন্ত খুলতে পারেন না। শুষ্ক মৌসুমে ধুলা ও বিষাক্ত গ্যাসের সঙ্গে এ ধোঁয়া মিলে ঢাকার বায়ুমানকে নিয়ে গেছে চরম অস্বাস্থ্যকর অবস্থায়। যদিও রাজধানীর দূষণ কমানোসহ পরিবেশ রক্ষায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোর আশ্বাস বছরের পর বছরে দিয়ে যাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দৈনিক উৎপাদিত সম্পূর্ণ বর্জ্যকে আমরা ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন মূল্যবান সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ‘সারা ঢাকা শহরের ময়লাগুলো এখানে এনে রাখা হয়। এলাকাবাসীও কিছু অস্বস্তি বোধ করছে। এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে, ময়লাকে সবসময় ক্র‌্যাশ করে এখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, পরিবেশ দুর্গন্ধমুক্ত হবে।’

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক ৩০০ ছাড়ালে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আর সেই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা, যার বড় একটি কারণ অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বর্জ্য থেকেই তৈরি হবে বড় ধরনের পরিবেশগত সংকট, যার প্রভাব পড়বে জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতার কারণে ঢাকা শহরের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বায়ু দূষনে পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করছে। এর পেছনে আমিবাজার, মাতুয়াইল এবং অন্যান্য জায়গায় যে ছোট ছোট ওয়েস্ট ডাম্পিং সাইটগুলো আছে, সেগুলোর আগুনে পোড়ানো অন্যতম একটি কারণ।’

এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, প্রতি বছরই রাজধানীতে বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। তাই পরিবেশ রক্ষা করতে হলে এখনই বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘আশপাশের মানুষগুলো যেরকম অবর্ণনীয় এক দুঃখ-কষ্টের মধ্যে আছে, সেখানে কিন্তু জনগণের ক্ষোভ এবং রোষ বাড়ছে। তাহলে রাষ্ট্র তো একটা এরকম একটা কমিউনিটি বা মহল্লা বা এলাকাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে না। এই এলাকাটাকে বাঁচানোর জন্য হলেও আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা চিন্তা করা দরকার। আধুনিক প্রকল্পগুলো বাংলাদেশে একটু দেরীতে হলেও শুরু করতে হবে।’

বর্জ্যের চাপ আর দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে ঢাকার পরিবেশ। বছরজুড়েই ধুলা, ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাসে বিপর্যস্ত বায়ুমান। এমন বাস্তবতায় অতি দ্রুত সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও নগরবাসীরা।

এসএইচ