Recent event

যে ৭ কারণে ভেঙে যায় রোজা; জানুন কোরআন ও হাদিসের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ
রোজা ভঙ্গের কারণসমূহ | ছবি: এখন টিভি
0

রমজান মাস কেবল উপবাসের নাম নয়, বরং এটি একটি আত্মিক প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণে সফল হতে হলে আমাদের জানতে হবে কোন কাজগুলো আমাদের রোজাকে নষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ সুরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে রোজার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই সীমার আলোকে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহর ভিত্তিতে রোজা ভঙ্গের ৭টি কারণ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

বিষয় (Subject) বিধান (Verdict) মন্তব্য (Note)
ইনহেলার (Inhaler) রোজা ভেঙে যায় ওষুধ ফুসফুসে পৌঁছায় বলে।
ইনজেকশন (ব্যথানাশক) রোজা ভাঙে না যদি পুষ্টিদায়ক না হয়।
ইনসুলিন (Insulin) রোজা ভাঙে না ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জায়েজ।
চোখ/কানের ড্রপ রোজা ভাঙে না অধিকাংশ আলেমের মতে জায়েজ।

আরও পড়ুন:

ইচ্ছাকৃত পানাহার করা (Eating and Drinking)

রোজা মানেই হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ত্যাগ করা। এই সময়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করলে রোজা ভেঙে যাবে। মুখ দিয়ে কোনো কিছু পাকস্থলীতে যাওয়া অথবা নাক দিয়ে পানি বা তরল কিছু ভেতরে প্রবেশ করানো—উভয় ক্ষেত্রেই রোজা নষ্ট হয়। ওজু করার সময় নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে নবিজি (সা.) বলেছেন, "অজুর সময় নাকে ভালোভাবে পানি পৌঁছিয়ে দাও, তবে রোজা পালনকারী হলে এমন করবে না।" (আবু দাউদ: ২৩৬৬)। অর্থাৎ নাকে পানি দেওয়ার সময় তা যেন ভেতরে না চলে যায় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তবে কেউ যদি ভুলে কিছু খেয়ে ফেলে বা পান করে, তবে তার রোজা ভাঙবে না। মনে পড়ার সাথে সাথে তা ত্যাগ করতে হবে।

খাদ্যের বিকল্প বা পুষ্টিদায়ক বস্তু গ্রহণ (Nutritional Alternatives)

বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার অনেক পদ্ধতি রয়েছে যা রোজা ভঙ্গের কারণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী: যদি কোনো অসুস্থ রোজাদারকে শরীরে রক্ত দেওয়া হয় (Blood Transfusion), তবে তার রোজা ভেঙে যাবে। কারণ রক্ত হলো পুষ্টির চূড়ান্ত রূপ। যেসব ইনজেকশন বা ড্রিপ শরীরে গ্লুকোজ বা পুষ্টি সরবরাহ করে (Nutritional Injections), তা গ্রহণ করলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে ব্যথা বা জ্বরের সাধারণ ইনজেকশন যা কেবল রোগের জন্য এবং যা পুষ্টি জোগায় না, তাতে রোজা ভাঙবে না।

সিঙ্গার মাধ্যমে রক্ত বের করা (Cupping/Hijama)

সিঙ্গা বা হিজামা লাগানোর মাধ্যমে শরীর থেকে রক্ত বের করলে রোজা ভেঙে যাওয়ার বিষয়ে হাদিসে শক্তিশালী বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, "সিঙ্গা যে লাগায় এবং যে লাগাতে সাহায্য করে, উভয়ের রোজা ভেঙে যাবে।" (আবু দাউদ: ২৩৬৭)। এর কারণ হলো সিঙ্গা লাগানোর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, যা রোজাদারকে রোজা পূর্ণ করতে সমস্যায় ফেলতে পারে। তবে বর্তমানের আধুনিক রক্ত পরীক্ষার জন্য সামান্য রক্ত দিলে রোজা ভাঙবে না বলে অধিকাংশ আলেম মত দিয়েছেন।

আরও পড়ুন:

ইচ্ছাকৃত বমি করা (Intentional Vomiting)

যদি কোনো রোজাদার নিজে থেকে চেষ্টা করে বমি করে, তবে তার রোজা বাতিল হয়ে যাবে। গলায় আঙুল দিয়ে, পেট চেপে অথবা দুর্গন্ধযুক্ত কোনো কিছুর ঘ্রাণ ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ে বমি করলে রোজা ভেঙে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যার অনিচ্ছাকৃত বমি হলো তার ওপর কোনো কাজা নেই, কিন্তু যে ইচ্ছাকৃত বমি করল সে যেন কাজা করে নেয়।" (তিরমিজি: ৭২০)। যদি অসুস্থতার কারণে অটোমেটিক বমি চলে আসে, তবে রোজা ভাঙবে না। মুখ পরিষ্কার করে রোজা পূর্ণ করতে হবে।

নারীর হায়েজ ও নেফাস (Menstruation and Post-childbirth)

নারীদের মাসিক ঋতুস্রাব (Period) অথবা সন্তান প্রসব পরবর্তী রক্তপাত শুরু হলে সাথে সাথে রোজা ভেঙে যাবে। সূর্য ডোবার মাত্র এক মিনিট আগেও যদি রক্ত দেখা দেয়, তবে ওই দিনের রোজা বাতিল বলে গণ্য হবে এবং পরবর্তীতে তা কাজা করতে হবে।

নবিজি (সা.) বলেছেন, "নারীর যখন হায়েজ হয়, তখন সে নামাজ ও রোজা ত্যাগ করে।" (সহিহ বুখারি: ৩০৪)। তবে রমজান পরবর্তী সময়ে কেবল রোজার কাজা আদায় করতে হয়, নামাজের নয়।

স্ত্রীর সাথে সহবাস করা (Sexual Intercourse)

রমজানে দিনের বেলা রোজা রাখা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করা সবচেয়ে বড় গুনাহ এবং রোজা ভঙ্গের প্রধান কারণ। এটি কেবল রোজাই নষ্ট করে না, বরং ব্যক্তির ওপর কঠোর দণ্ড বা কাফফারা ওয়াজিব করে। এর ফলে রোজা বাতিল হয়, তওবা করা ওয়াজিব হয় এবং দিনের বাকি সময় পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। পরবর্তীতে এই রোজার কাজা আদায় করতে হবে। অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী এর কাফফারা হলো—একজন দাস মুক্ত করা (বর্তমানে যা সম্ভব নয়), অথবা একটানা ৬০ দিন রোজা রাখা। যদি শারীরিক অক্ষমতার কারণে তাও সম্ভব না হয়, তবে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি নবিজি (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, "আমি ধ্বংস হয়ে গেছি।" নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, "কী হয়েছে?" তিনি বললেন, "আমি রমজানে রোজা থাকা অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি।" নবিজি তখন তাকে পর্যায়ক্রমে কাফফারা আদায়ের নির্দেশ দেন। (সহিহ বুখারি: ১৯৩৬)

ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত ঘটানো (Intentional Ejaculation)

ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভাঙে না, কারণ তাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যাবে। হস্তমৈথুন (Masturbation), স্ত্রীকে আলিঙ্গন বা স্পর্শ করার মাধ্যমে যদি বীর্যপাত ঘটে, তবে রোজা নষ্ট হবে। এক্ষেত্রে কেবল কাজা ওয়াজিব হয়, কাফফারা নয় (সহবাস না হলে)। তবে এটি একটি জঘন্য গুনাহ।

নবিজি (সা.) রোজা অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কোমল আচরণ করতেন, কিন্তু তিনি তার কামভাব নিয়ন্ত্রণে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাদের জন্য রোজা অবস্থায় আলিঙ্গন বা চুম্বন থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।

আরও পড়ুন:

ক্র. নং কারণ (Reason) সংবিধান ও হাদিস সূত্র
০১স্ত্রী সহবাস করাবুখারি ১৯৩৬; মুসলিম ১১১১
০২ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত ঘটানোবুখারি ১৮৯৪; মুসলিম ১১৫১
০৩খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করাসুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭
০৪রক্ত বা পুষ্টিদায়ক ইনজেকশন গ্রহণশরীয়াহ বিশেষজ্ঞ মত (খাদ্যের বিকল্প)
০৫সিঙ্গার মাধ্যমে রক্ত বের করাআবু দাউদ ২৩৬৭; আহমাদ ৫/২৭৭
০৬ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করাতিরমিজি ৭২০; আবু দাউদ ২৩৮০
০৭হায়েজ ও নেফাস (ঋতুস্রাব)সহিহ বুখারি ৩০৪

ক্র. নং কারণ (Reason) সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা (Explanation)
০১স্ত্রী সহবাস (Intercourse)রোজা অবস্থায় সহবাস করলে রোজা কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়।
০২ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত (Intentional Ejaculation)হস্তমৈথুন বা স্পর্শের মাধ্যমে বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যায়।
০৩পানাহার করা (Eating and Drinking)ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু মুখে বা নাকে দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করানো।
০৪খাদ্যের বিকল্প গ্রহণ (Nutritional Injection)শরীরে পুষ্টিদায়ক ইনজেকশন বা রক্ত গ্রহণ করা।
০৫সিঙ্গা লাগানো (Cupping)রক্ত বের করার মাধ্যমে শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এটি রোজা ভঙ্গের কারণ।
০৬ইচ্ছাকৃত বমি (Intentional Vomiting)ইচ্ছে করে মুখ ভরে বমি করলে রোজা ভেঙে যায়।
০৭হায়েজ ও নেফাস (Menstruation)নারীদের ঋতুস্রাব বা প্রসব পরবর্তী রক্ত শুরু হলে রোজা বাতিল হয়।

আরও পড়ুন:

এসআর