শৈশব ও রাজনৈতিক বংশধারা
তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, এক ঐতিহাসিক পরিবারে। তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি; আর মা খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন।
রাষ্ট্রপতির সন্তান হিসেবে শৈশব কেটেছে শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় আচার-অনুশাসনের পরিবেশে। ঢাকার বিএএফ শাহীন স্কুল ও রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক দর্শনের ক্লাসিক চিন্তাবিদদের ভাবনা তাকে আকৃষ্ট করে।
তবে ভাগ্যের নির্মম বাঁক আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তার বাবা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতির পুত্র থেকে রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত বাস্তবতায় নেমে আসে পরিবারটি। শোকাহত গৃহিণী থেকে রাজনীতির নেত্রী হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া; আর তার পাশে থেকেই রাজনীতির ভিতরকার পাঠ নিতে শুরু করেন তারেক।
মায়ের নেতৃত্ব, সঙ্গে রাজনীতির পাঠ
স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু আশির দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন হন। ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এ সময় থেকেই তারেক রহমান দলীয় রাজনীতির ভেতরের পাঠ নিতে শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থেকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান
স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় হন। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপির পুনরুত্থানের সময় তিনি সংগঠনের তৃণমূলে কাজ করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসন নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি রাজনৈতিক অফিস স্থাপন করেন; যা পরে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠক। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন।
সমর্থকেরা বলেন, তিনি ছিলেন আধুনিক সাংগঠনিক রাজনীতির স্থপতি; সমালোচকেরা বলেন, ‘ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্র’। এই দ্বৈত ভাবমূর্তিই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পরিচয় তৈরি করে।
গ্রেপ্তার, কারাবাস ও নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায়
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দি হন। বিএনপি অভিযোগ করে, রিমান্ডে নির্যাতনে তার শারীরিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পেয়ে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান, যা পরিণত হয় প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসনে।
এ সময়ে দেশে বিএনপি পড়ে ইতিহাসের অন্যতম দুঃসময়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে পরাজয়, আন্দোলনে দমন-পীড়ন, খালেদা জিয়ার কারাবাস; সব মিলিয়ে দলটি কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। সেই শূন্যতা পূরণ করেন লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানই। ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক, নির্দেশনা ও বক্তব্য দিয়ে তিনি দূর থেকেই দল পরিচালনা করেন।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। নির্বাসনেই থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখেন; যা পরে তার প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রত্যাবর্তন
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মামলার সাজা বাতিল ও আইনি বাধা দূর হলে দেশে ফেরার পথ খুলে যায় তারেক রহমানের।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তিনি লাখো কর্মী-সমর্থকের অভ্যর্থনায়। তবে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি আবারও আঘাত হানে। পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মা খালেদা জিয়া। শোক ও দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিয়ে ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হন তিনি।
‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’: নতুন ইমেজ ও নির্বাচনি কৌশল
দেশে ফিরে তারেক রহমান নিজেকে পুনর্গঠন করেন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। প্রতিশোধ নয়, স্থিতিশীলতা ও পুনর্মিলনের ভাষা ব্যবহার করেন। তরুণদের সঙ্গে সংলাপ, সুশাসন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি। এসব হয়ে ওঠে তার প্রচারের মূল সুর। দেশে প্রত্যাবর্তনের সমাবেশে মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’র অনুকরণে তিনি বলেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। এ স্লোগানেই গড়ে ওঠে তার নির্বাচনি বার্তা; শান্তি, জবাবদিহিতা, দুর্নীতিদমন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র।
আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রচার, ভাসমান ভোটার টানার চেষ্টা এবং তৃণমূল সংগঠন পুনরুজ্জীবন; সব মিলিয়ে বিএনপি পায় দুই-তৃতীয়াংশ আসনের জয়।
জয়ী হিসেবে অঙ্গীকার
নির্বাচন জয়ের পর প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান জানান, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষায়, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারি-বিরোধী সব নাগরিকের জন্য আইন সমান। নির্বাচনকালীন বিরোধ যেন প্রতিহিংসায় না রূপ নেয়, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
প্রতিশোধ নয়, স্থিতিশীলতার বার্তা
নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিশোধ দিয়ে ভালো কিছু আসে না। এখন দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’
তিনি ভিন্নমত ও ভিন্ন দলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মতোই এবার দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থেকে রাষ্ট্রনায়কত্ব
কৈশোরে পিতৃহত্যা, যৌবনে কারাবাস, মধ্যবয়সে নির্বাসন—এই তিন অধ্যায় পেরিয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি। যেখানে পতন স্থায়ী নয়, নির্বাসন শেষ নয়, আর প্রত্যাবর্তন সব সময় অসম্ভবও নয়।
নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়; এ যাত্রা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ শব্দ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই সবচেয়ে উজ্জ্বল ভোর আসে। তিনিই এখন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। যার শপথ হয়ে গেলো ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।





