অধ্যায় এক: উত্থান ও বিত্তবৈভবের নেপথ্যে
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন পড়াশোনা শেষ না করেই কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। পরবর্তীতে তার গাণিতিক মেধার কারণে ওয়াল স্ট্রিটের (Wall Street) নামী প্রতিষ্ঠান বেয়ার স্টার্নস-এ জ্যেষ্ঠ অংশীদার হন। ১৯৮২ সালে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পর তিনি বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক বনে যান। তার মালিকানায় ছিল নিউ মেক্সিকোর বিশাল র্যাঞ্চ, নিউইয়র্কের আলিশান ম্যানশন এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে একটি ব্যক্তিগত দ্বীপ (Little Saint James Island), যা পরবর্তীতে ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ (Pedophile Island) নামে কুখ্যাতি পায়।
আরও পড়ুন:
অধ্যায় দুই: ভিআইপি নেটওয়ার্ক ও প্রভাবশালী বন্ধুগণ
এপস্টেইনের বিশেষত্ব ছিল সমাজের উঁচুতলার মানুষের সাথে তার গভীর সখ্য। প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এক সময় তাকে ‘দারুণ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এছাড়াও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (Bill Clinton), অভিনেতা কেভিন স্পেসি এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর (Prince Andrew) নাম তার বন্ধু তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে প্রিন্স অ্যান্ড্রু তার বিরুদ্ধে আনা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ (Sex abuse allegations) নিষ্পত্তির জন্য পরবর্তীতে মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেন।
অধ্যায় তিন: অন্ধকার যৌন পাচার নেটওয়ার্ক (Sex Trafficking Network)
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় প্রথম তার বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়নের (Minor girl abuse) অভিযোগ আসে। তদন্তে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের একটি পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। এতে তাকে সরাসরি সহায়তা করতেন তার প্রাক্তন প্রেমিকা গিসলেন ম্যাক্সওয়েল (Ghislaine Maxwell), যিনি বর্তমানে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ২০০৮ সালে এক বিতর্কিত ‘শতাব্দীর চুক্তি’র (Deal of the century) মাধ্যমে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এড়িয়ে মাত্র ১৩ মাসের সাজা ভোগ করে মুক্ত হন।
অধ্যায় চার: রহস্যজনক মৃত্যু ও ‘এপস্টেইন ফাইলস’ (The Epstein Files)
২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিউইয়র্কের এক সুরক্ষিত কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যান (Jeffrey Epstein death conspiracy) এপস্টেইন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষরে সব নথিপত্র প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রকাশিত এসব নথি বা ‘এপস্টেইন লিস্ট’ (Epstein List 2024-25) থেকে বেরিয়ে আসছে প্রভাবশালী রাজনীতিক ও তারকাদের নাম, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
আরও পড়ুন:
কুখ্যাত ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপ (The Infamous Island)
ক্যারিবীয় সাগরের ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে অবস্থিত এই দ্বীপটির আসল নাম লিটল সেন্ট জেমস (Little Saint James)। তবে নির্যাতনের ভয়াবহতার কারণে এটি ‘পেডোফাইল আইল্যান্ড’ (Pedophile Island) বা ‘যৌন দ্বীপ’ হিসেবে কুখ্যাতি পায়।
সুযোগ-সুবিধা: ৭২ একরের এই দ্বীপে বিশাল ভিলা, লাইব্রেরি, সিনেমা হল, জিমনেসিয়াম এবং একটি অদ্ভুত ‘নীল-সাদা ডোরাকাটা মন্দির’ (Music Pavilion) ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত ছবিতে সেখানে একটি ডেন্টিস্টের চেয়ারও দেখা গেছে।
নিরাপত্তা ও পরিবহন: দ্বীপে যাতায়াতের জন্য এপস্টেইনের নিজস্ব হেলিকপ্টার এবং ব্যক্তিগত জেট বিমান (Lolitа Express) ব্যবহার করা হতো। দ্বীপের চারদিকে সশস্ত্র প্রহরী থাকত।
যা ঘটত সেখানে: অভিযোগ রয়েছে, মডেল বানানোর প্রলোভন দিয়ে কিশোরীদের এই দ্বীপে আনা হতো। তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো যাতে তারা পালাতে না পারে। প্রভাবশালী বন্ধুদের আপ্যায়ন করার নাম করে এখানে ভয়াবহ যৌন শোষণ চালানো হতো।
তদন্তে উঠে আসা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা (The Influence List)
২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত নথিতে কয়েকশ বিখ্যাত ব্যক্তির নাম ও ছবি পাওয়া গেছে। তবে মনে রাখা জরুরি, তালিকায় নাম থাকা মানেই তারা অপরাধী নন; বরং তারা কোনো না কোনোভাবে এপস্টেইনের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন বা তার দ্বীপে/বাড়িতে গিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন:
‘এপস্টেইন ফাইলস’ থেকে উঠে আসা সবচেয়ে বড় ৫টি গোপন তথ্য
১. ব্ল্যাকমেইলের জন্য গোপন ক্যামেরা ও ফুটেজ (Hidden Cameras for Blackmailing)
তদন্ত নথিতে প্রকাশ পেয়েছে যে, এপস্টেইন তার ব্যক্তিগত দ্বীপ এবং নিউইয়র্কের ম্যানশনের প্রতিটি রুমে অত্যন্ত শক্তিশালী গোপন ক্যামেরা (Hidden Cameras) বসিয়েছিলেন। তিনি তার প্রভাবশালী বন্ধুদের যৌন লালসার ভিডিও রেকর্ড করতেন যাতে ভবিষ্যতে তাদের ব্ল্যাকমেইল (Blackmail) করে নিজের ফায়দা লুটতে পারেন। উদ্ধারকৃত মেমোরি কার্ডে একাধিক হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির আপত্তিকর ফুটেজ পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তকারী দল।
২. সেই রহস্যময় নীল-সাদা মন্দির (The Mysterious Temple Secrets)
এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপে অবস্থিত নীল-সাদা ডোরাকাটা যেটিকে মানুষ 'মিউজিক প্যাভিলিয়ন' বা মন্দির (Epstein's Temple) মনে করত, তার ভেতরে মাটির নিচে বিশাল এক গোপন কক্ষের (Underground Bunker) সন্ধান পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এই কক্ষটি ছিল শব্দরোধী (Soundproof), যেখানে ভয়ংকর সব নির্যাতন চালানো হতো যাতে বাইরে থেকে কেউ চিৎকার শুনতে না পায়।
৩. স্টিফেন হকিং ও অদ্ভুত প্রলোভন (Stephen Hawking Misconception)
প্রকাশিত একটি ইমেইলে দেখা গেছে, বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংকে (Stephen Hawking) নিয়ে এপস্টেইন তার এক সহযোগীকে লিখেছিলেন। সেখানে দাবি করা হয়েছিল যে, হকিং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নগ্ন অবস্থায় কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে দেখেছিলেন। তবে হকিংয়ের সমর্থকরা একে এপস্টেইনের সাজানো গল্প এবং তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।
৪. 'লোলিটা এক্সপ্রেস' ও ভিআইপি লগবুক (The Lolita Express Logbook)
এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জেট বিমান, যা 'লোলিটা এক্সপ্রেস' (Lolita Express) নামে পরিচিত ছিল, তার পূর্ণাঙ্গ লগবুক প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি যারা আগে দাবি করেছিলেন তারা কখনোই এপস্টেইনের সাথে বিমানে চড়েননি, তাদের নাম ও সই সেই তালিকায় রয়েছে। এই তালিকায় একাধিক বিশ্বনেতা ও হলিউড তারকার নাম পাওয়া গেছে।
৫. ডেন্টিস্টের চেয়ার ও চিকিৎসকদের সংশ্লিষ্টতা (Dentist Chair and Medical Abuse)
দ্বীপে তল্লাশি চালিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টিস্টের চেয়ার ও কিছু চিকিৎসার সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, এপস্টেইন মেয়েদের দাঁত বা হাড়ের গঠন পরিবর্তনের জন্য চিকিৎসকদের দ্বীপে নিয়ে আসতেন যাতে তাদের বয়স শনাক্ত করা কঠিন হয় এবং তাদের পরিচয় আড়াল করা যায়।
আরও পড়ুন:





