চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে এমপি হতে চাওয়া বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরী ভাগ্যবানই বটে। মাথায় তার ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা জনগণের আমানতের ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ, বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও যা পরিশোধ করেননি। কিন্তু বড় দলের বড় নেতার উপদেষ্টাকে সৌজন্যতা দেখিয়ে যেন দায় পরিশোধ করেছেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদের ভাষায়— ‘কমিশনের কাছে প্রমাণ থাকার পরও, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’
নির্বাচন কমিশনার মাছউদের সৌজন্যতা কিংবা আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মায়াকান্না রাজনীতির মাঠে কতটা প্রভাব তৈরি হলো সেটি বিশ্লেষণের বিষয়, কিন্তু শীর্ষ এই ঋণখেলাপির প্রতি নির্বাচন কমিশনের মায়া কান্নাকে অবশ্য ভালোভাবে নেননি ভোটাররা। এর কারণ হয়তো তিল তিল করে জমানো টাকা জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে তুলতে না পারার ক্ষোভ থেকে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিটি নির্বাচনের আগে যেভাবে ঋণখেলাপি ধরার মহড়া চলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসনের অন্দরে-বাইরে, তা শেষ পর্যন্ত টেকে না কেন?
সহকারী এটর্নি জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘কোর্ট এখানে দুটি বিষয় খুব বিবেচনা করে। একটা হচ্ছে ইকুইটির ব্যাপারটা, যে একটা লোক ব্যবসা করছে, হঠাৎ করে যদি তাকে থামিয়ে দেয়া হয়, তাহলে কী হবে? একটা সুযোগ দিয়ে দেখি। তো এ সুযোগের কন্ডিশন হিসেবে বলে যে, ১০ শতাংশ টাকা দিয়ে আসেন। তখন তারা যদি গুড ইনটেনশন দেখায় যে, তারা তো কিছু টাকা দিয়েছে, এবারের মতো একটু স্টপ থাক। এটাকেই অনেকে মিস-ইউজ করে।’
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, পক্ষপাতসহ অনেক অভিযোগের পরও এবারে মাঠ পর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৮২ এমপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিলো ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে। কিন্তু শেষমেষ সেখান থেকে এই সংখ্যা এসে দাড়িয়েছে ৪৫ এ। যার অন্তত ৩০ জন প্রার্থীতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন।
আদালতের স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩০ খেলাপির মধ্যে ১৪ জনই বিএনপির। শুরুতে খেলাপির তালিকায় জামায়াত ইসলামীর দুজন থাকলেও একজন অর্থ পরিশোধ করে অন্যজন বৈধতা পান আদালতের স্থগিতাদেশে। বৈধতা দেয়া হয় নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। সুযোগ পাচ্ছেন জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির ১ জন করে। এছাড়া স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ১১ ঋণ খেলাপি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যাচ্ছেন বড় বড় খেলাপিরা। যদিও অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের সুযোগের পক্ষে মত অনেকের।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিনি ঋণখেলাপি কি না সেটা তো সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক আছে, আবার অনেকে কোর্টে গিয়ে একটা রায় নিয়ে আসেন।’
আরও পড়ুন:
অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘কেউ যদি ওই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি না হন, তাহলে তাকে এ ধরনের সুযোগ কোনো কোনো সময় দিতে হয়।’
তবে উল্টো কথা বলছেন সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী। তিনি বলছেন, স্থগিতাদেশের দোহাই দিয়ে নির্বাচন করতে দেয়ার কে সুযোগ নেই। স্থগিতাদেশ থাকলেও বিদ্যমান আইনে খেলাপিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার এখতিয়ার রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘স্টে অর্ডার থাকলেই সে ব্যাংকরাপ্ট থেকে উঠে আসে না। এটা সীমিত সময়ের জন্য একটা প্রোটেকশন অর্ডার। এ অর্ডার দিয়ে তাকে ব্যাংকরাপ্ট থেকে বাইরে আনার কোনো সুযোগই নেই। আইনের মধ্যে নেই।’
আদালতের স্থগিতাদেশ আর নির্বাচন কমিশনের ছাড় পেলেও সাধারণ মানুষ ভোটের মাধ্যমে খেলাপিদের লাল কার্ড দেখাবে এমনটিই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।





