জামায়াত ঘোষিত রূপরেখায় রয়েছে— দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স; ট্যাক্স ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) বর্তমান হার থেকে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ট্যাক্স ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ; স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু (এনআইডি, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এক কার্ডে অন্তর্ভুক্ত); আগামী তিন বছরে সব শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চার্জ না বাড়ানো; বন্ধ কলকারখানা পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে চালু করা এবং এর ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের প্রদান; কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা।
এছাড়া গ্রাজুয়েশন শেষে চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫ লাখ গ্রাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান; মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ; প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়। এর মাধ্যমে মেধাবী দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড ও ক্যাম্ব্রিজে পড়ার সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়।
রূপরেখায় আরও রয়েছে— ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজ একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা; ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা; ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা; এবং ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’-এর আওতায় গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
আরও পড়ুন:
সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর বাংলাদেশ এখন একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; বরং ১৮ কোটির বেশি মানুষের দেশের জন্য শাসনব্যবস্থার নতুন দিশা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা অর্জন। শিক্ষিত তরুণেরা তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। নারীরা এখনো নানা কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও কোটি কোটি মানুষ সামান্য একটি সংকটেই দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছেন।’
এই বাস্তবতাগুলো সৎভাবে মোকাবিলার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। অর্থনৈতিক সাফল্য এমন হওয়া উচিত, যাতে মানুষ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিকল্পনা করতে পারে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার পরিচালনা করতে পারে এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারে।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের বাইরে কর্মরত লাখো প্রবাসী শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিবারকে সহায়তা করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করছে। তবে তাদের অবদান শুধু অর্থনৈতিক নয়; তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক জ্ঞান নিয়ে দেশে আরও বড় ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।’
আরও পড়ুন:
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবী; শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তারা—আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের অনেকেই দেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নতুন প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দেয়া ও সংস্কারে সহায়তা করতে প্রস্তুত।’
অর্থনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘কর্মসংস্থানকে বিনিয়োগের পার্শ্বফল হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ধীরে ধীরে অনানুষ্ঠানিক শ্রমকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাষ্ট্র ও নাগরিক, সরকারি ও বেসরকারি খাত এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যকার অংশীদারত্বের ওপর। সম্পৃক্ততা, সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।’
আরও পড়ুন:
নারীর অংশগ্রহণ ও কাঠামোগত সংস্কার
বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সম্মেলনে উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো দেশ টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না।’
জামায়াত আয়োজিত এই সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তানসহ ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন বলে আয়োজকেরা জানান।





