যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থে যে করেই হোক গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা চাচ্ছেন ট্রাম্প। একের পর এক হুমকিতে আভাস মিলছে সহজে না পেলে সামরিক পদক্ষেপ চালাতেও তোয়াক্কা করবে না ওয়াশিংটন। নয়তো রাশিয়া বা চীনের কাছে দ্বীপটি হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে দাবিও করছেন হোয়াট হাউজের অধিপতি।
জটিলতা হলো, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র একা মোড়ল হিসেবে ভূমিকা খাটাতে পারে না। ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে মিলেই তা নিশ্চিত করতে হবে।
এমনকি ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ট্রান্স-আটলান্টিক জোট ন্যাটোর সদস্য। যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি গুরুতর করে তুলছে।
এমন পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ড দখলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ট্রাম্প একা কিছু করে বসলে বিপর্যয় অনিবার্য। ট্রাম্প প্রশাসন যদি একতরফাভাবে গ্রিনল্যান্ড দখল করে, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিরাপত্তার জন্য ইউরোপ যে ট্রান্স আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোটের ওপর নির্ভর করে এসেছে সেই ন্যাটের সমাপ্তি ঘটবে বলে সতর্কও করে রেখেছে ডেনমার্ক।
এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটো ও ইউরোপ আছে মহা বিপদে। এদিকে ইতালিও সাফ জানিয়ে দিয়েছে গ্রিনল্যান্ড দখলে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন দেবে না তারা। আর ন্যাটো-যুক্তরাষ্ট্র সংকটের শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে পোল্যান্ড। কারণ গত বছর রুশ ড্রোন আকাশসীমা লঙ্ঘনের পর থেকে নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোর ওপর ভরসা বাড়িয়েছে দেশটি। এমন সময় পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে ভাঙন দেখা দিলে নিঃসন্দেহে বড় সংকট।
ওয়াশিংটনের হুমকির কারণে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) কেন্দ্রীয় মূলনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মূলনীতিটি হলো—জোটের কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরে জবাব দেয়া হবে; কিন্তু এখন জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যই আরেক সদস্যদেশের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে। যা গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ঝড় ধেয়ে আসার মতো। সেই ঝড় পশ্চিমা শক্তিকেও তছনছ করে দিতে পারে।
আরও পড়ুন:
ইতোমধ্যে ন্যাটোর মূলনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ জোটের কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে, তা সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরে জবাব দেয়ার কথা। কিন্তু এখন জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্রই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সদস্যদেশের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে।
সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলারও বলেছেন, ‘আমরা একটি পরাশক্তি। আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করবো।’
তার এ কথাও এমন এক পুরোনো পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন শক্তিশালীরা যা পারতো দখল করতো। আর দুর্বলেরা দখলদারি মেনে নিতো। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ডেনমার্ক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতজানু না হওয়ার বার্তা দিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ইউরোপের বেশিরভাগ নেতা মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। তারা হয়তো মনে করছেন-যুক্তরাষ্ট্র আগের মতো ইউরোপের নির্ভরযোগ্য মিত্র নয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য অপরিহার্য।
এছাড়া রাশিয়াকে মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতাও বড় কারণ হতে পারে। ফলে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি ইস্যুতে দোটানায় রয়েছে ইউরোপ।
দোটানার বিষয়টি এমন যে, একদিকে গ্রিনল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখা। আবার ইউক্রেনের বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে সক্রিয় রাখার চ্যালেঞ্জের। কিন্তু এটা সম্ভব কি না তাই এখন বড় প্রশ্ন।
স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে ১৯৫১ দ্বিপক্ষীয় একটি চুক্তির আওতায়, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। চূড়ান্ত স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে সেখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা থাকলেও এখন তা কমে প্রায় ২০০ জনে নেমেছে। এখন ট্রাম্পের দখল বাসনায় যদি নতুন ভূ-রাজনৈতিক ঝড় ধেয়ে আসে, তাতে বিশ্ব শাসন ব্যবস্থাও লন্ডভন্ড হওয়ার শঙ্কা প্রকট।




