যাকে নিজের চেয়েও ওপরে মানেন কার্লো আনচেলত্তি: কে এই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন?

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ও কার্লো আনচেলত্তি
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ও কার্লো আনচেলত্তি | ছবি: এখন টিভি
1

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ছাড়া ফুটবল বিশ্বে তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ বা যোগ্য আর কোনো কোচ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কোচিং নিয়ে ওঠা কিছু সমালোচনার জবাবে নিজের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড।

অ্যানচেলত্তি বলেন, ‘আমি ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি ম্যাচের জন্য দল প্রস্তুত করেছি। কেবল একজন মানুষেরই আমার চেয়ে বেশি ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, তিনি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন, যিনি ২ হাজারের বেশি ম্যাচে ডাগআউটে ছিলেন। আমাকে উপদেশ দেওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি যদি কেউ থাকেন, তিনি শুধুই ফার্গুসন।’

আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ হয়েও আনচেলত্তি যাকে নিজের চেয়েও ওপরে স্থান দিয়েছেন, কে এই স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন? কেনই-বা তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিংবা অনেকের মতে সর্বকালের সেরা ফুটবল মস্তিষ্ক বলা হয়?

ফুটবলের ইতিহাসে সেরা কোচ কে—এই প্রশ্নের জবাবে পেপ গার্দিওলা, হোসে মরিনহো বা রাইনাস মিশেলের নাম আসতেই পারে। তবে ২০১৩ সালে ‘ওয়ার্ল্ড সকার’ পত্রিকার অধীনে ৭৩ জন ফুটবল বিশেষজ্ঞের ভোটে সর্বকালের সেরা কোচের যে তালিকা হয়েছিল, সেখানে ৪৯টি ভোট পেয়ে শীর্ষস্থানটি দখল করেছিলেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন।

আরও পড়ুন:

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যানেজারদের জন্য সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড ‘দ্য লিগ ম্যানেজারস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডস’ তিনি জিতেছেন সর্বোচ্চ চারবার। এছাড়া ‘প্রিমিয়ার লিগ ম্যানেজার অব দ্য সিজন’ পুরস্কার তিনি জিতেছেন রেকর্ড ১১ বার। একমাত্র কোচ হিসেবে টানা তিনবার এই পুরস্কার জেতার কীর্তিও তার। ‘প্রিমিয়ার লিগ ম্যানেজার অব দ্য মান্থথ’ বা মাসের সেরা কোচের পুরস্কারও সর্বোচ্চ ২৭ বার উঠেছে তার হাতে। গ্রেটদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে ব্যবধানটা অনেক বাড়িয়ে নেন, যা ফার্গুসন মাঠের পরিসংখ্যানে বারবার করে দেখিয়েছেন।

১৬ বছর বয়সে অপেশাদার ক্লাব কুইনস পার্কের হয়ে ফার্গুসনের ফুটবলার জীবনের শুরু। এরপর সেন্ট জন্সটন ঘুরে ১৯৬৪ সালে স্কটিশ ক্লাব ‘ডানফার্মলাইন অ্যাথলেটিকে’ যোগ দিয়ে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সে বছর ৩১ গোল করে তিনি লিগের টপ স্কোরার হন। পরবর্তীতে তৎকালীন রেকর্ড ৬৫,০০০ পাউন্ডের বিনিময়ে স্কটিশ জায়ান্ট রেঞ্জার্সে যোগ দেন তিনি। ১৯৬৯ সালে ফালকার্ক এবং পরবর্তীতে এয়ার ইউনাইটেডের হয়ে ১৯৭৪ সালে বুট জোড়া তুলে রাখেন এই স্কটিশ স্ট্রাইকার।

খেলোয়াড়ি জীবন শেষে মাত্র ৩২ বছর বয়সে সাপ্তাহিক মাত্র ৪০ ইউরো বেতনে স্টার্লিংশায়ারের পার্ট-টাইম কোচ হিসেবে ডাগআউটে দাঁড়ান ফার্গি। এরপর সেন্ট মার্টিনকে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন করে নিয়ে আসেন আলোচনার কেন্দ্রে। ১৯৭৮ সালে দায়িত্ব নেন স্কটিশ ক্লাব আবার্ডিনের। দীর্ঘ ১৫ বছর ওল্ড ফার্মের (সেল্টিক ও রেঞ্জার্স) আধিপত্য ভেঙে ১৯৫৫ সালের পর আবার্ডিনকে স্কটিশ লিগ জেতান তিনি। তবে বিশ্ব ফুটবলকে সবচেয়ে বড় চমক দেন ১৯৮৩ সালের ইউরোপিয়ান উইনার্স কাপের ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে ট্রফি জিতে।

আরও পড়ুন:

১৯৮৬ সালের নভেম্বরে যখন রন অ্যাটকিনসন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচের দায়িত্ব ছাড়েন, দল তখন লিগ টেবিলের ২১ নম্বরে ধুঁকছিল। রেলিগেশনের শঙ্কায় থাকা সেই ক্রান্তিকালে ওল্ড ট্রাফোর্ডের ডাগআউটে আগমন ঘটে ফার্গুসনের। দায়িত্ব নিয়েই ক্লাবে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দিকে নজর দেন তিনি, কারণ দলের বড় তারকাদের অনেকেই তখন মাদকাসক্ত ও হতাশ ছিলেন।

প্রথম কয়েক বছর সফলতা ধরা না দিলেও ১৯৯০ সালের এফএ কাপ জয় ফার্গির চাকরি বাঁচিয়ে দেয়। এরপর ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড এরিক ক্যান্টোনাকে দলে ভেড়ানোর পর ১৯৯২-৯৩ সিজনে ২৬ বছর পর প্রথম প্রিমিয়ার লিগ টাইটেল জেতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি রেড ডেভিলদের।

স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালী বছর ছিল ১৯৯৮-৯৯ মৌসুম। সেবার একই সিজনে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ঐতিহাসিক ‘ট্রেবল’ এনে দেন তিনি। এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর ইংল্যান্ডের রানী এলিজাবেথ দ্বিতীয়ের কাছ থেকে নাইটহুড উপাধি পান তিনি, যার ফলে তার নামের আগে যুক্ত হয় সম্মানসূচক ‘স্যার’।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে বদলে ফেলা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল ফার্গুসনের। ২০০২ সালের পর দলের সিনিয়ররা চলে গেলে তিনি সম্পূর্ণ তরুণদের নিয়ে দল পুনর্গঠন করেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ওয়েইন রুনি, রিও ফার্ডিনান্ড, নেমানিয়া ভিডিচদের মতো তরুণদের দলে এনে গড়ে তোলেন এক অপরাজেয় স্কোয়াড, যা ২০০৮ সালে ক্লাবকে এনে দেয় দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।

আরও পড়ুন:

খেলোয়াড়দের কাছে তিনি ছিলেন হাইস্কুলের হেডমাস্টারদের মতোই কড়া, তাই সবাই তাকে ডাকত ‘দ্য বস’। মুখের চুইংগাম চিবানোকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন নিজস্ব ব্র্যান্ডে। ম্যাচের শেষ মুহূর্তের ইনজুরি সময়ে তার দল অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ জিতে ফিরত বলে ফুটবল বিশ্বে ওই সময়টুকু ‘ফার্গি টাইম’ নামে পরিচিতি পেয়ে যায়।

২৬ বছরের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্যারিয়ারে ক্লাবকে এনে দিয়েছেন রেকর্ড ৩৮টি ট্রফি (সব মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার ট্রফি ৪৯টি)। টানা ২০ মৌসুমে লিগ টেবিলের শীর্ষ তিনে থেকে মৌসুম শেষ করার একমাত্র রেকর্ডটি তারই। তিনি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছেন রেকর্ড ১৩ বার। তার এই অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ওল্ড ট্রাফোর্ডে তার জীবদ্দশাতেই ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে এবং স্টেডিয়ামের একটি স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছে ‘স্যার এলেক্স ফার্গুসন স্ট্যান্ড’।

২০১২-১৩ সিজনে ম্যানইউকে ২০তম লিগ টাইটেল জিতিয়ে অবসরে যান ‘দ্য বস’। ফার্গুসনের বিদায়ের পর ওল্ড ট্রাফোর্ডের সেই চেনা ধার হারিয়ে যায়, শত শত কোটি টাকা খরচ করেও ক্লাবটি দীর্ঘ সময় লিগ জিততে পারেনি। ফার্গির এই অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে তিনি ওল্ড ট্রাফোর্ডের জন্য কতটা অপরিহার্য ছিলেন।

তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা; কোনো জাতীয় দলের হয়ে কখনো বিশ্বকাপে যাওয়া হয়নি তার। তবে কার্লো আনচেলত্তির মতো বিশ্বজয়ী বর্তমান কোচেরা যখন অকপটে স্বীকার করেন যে উপদেশ নেয়ার মতো ফুটবল মস্তিস্ক পৃথিবীতে একজনই আছেন, তখন বোঝা যায় ট্রফি বা পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন ফুটবল ইতিহাসের এক চিরন্তন ও অবিসংবাদিত সম্রাট।

এসএইচ