ঘুটঘুটে অন্ধকার। পুরো ভুতুড়ে এক পরিবেশ। যেন কবরের আরেক রূপ। যেখানে দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো নিরীহ, নিরপরাধ মানুষকে। করা হতো নির্মম পাশবিক নির্যাতন। এটি রাজধানীর উত্তরায় অবস্থায় র্যাব-১ এর অধীনস্থ একটি আয়নাঘরের দৃশ্য। যেখানে গুম করে রাখা হয়েছিল জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমানকে।
সরু সিঁড়ি বেয়ে যে অন্ধকার পথ আবিষ্কার হয়েছে, সে পথের শেষে শক্ত ইটের কনক্রিট বিছানা। পাশে বসান ইলেকট্রিক চেয়ার। যেখানে বসিয়ে মৃত্যু কাঁপুনি দেয়া হতো জীবন্ত মানুষকে। এটিও র্যাব-১ এর উত্তরার আরেকটি দৃশ্য। সূত্র বলছে, আয়না ঘরের প্রতিটি কক্ষের আয়তন ৪ ফিট লম্বা, ৪ ফিট চওড়া। কোনোটি তারচেয়েও ছোটো। অর্থাৎ মানুষের বাসাবাড়ির যে স্বাভাবিক খাট বা বিছানা থাকে, তার থেকেও সরু আয়নাঘরের কক্ষগুলো।
বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘সেলের মধ্যে আলো ঢোকার কোনো রাস্তা ছিল না। কক্ষটা একবারে বিল্ডিংয়ের মাঝখানে ছিল। মাসখানেক আমি নামাজ পড়ার জন্য জিজ্ঞাসা করেছি পশ্চিম কোন দিকে। কোনো জবাব পেতাম না।’
এবার দেখা যাক আরেকটি টর্চার সেলের চিত্র। যেখানে লাগানো কিছু এক্সস্ট ফ্যান। বন্দিশালার এই কক্ষগুলোও কবরের মত ছোটো। এগুলো রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকার দৃশ্য। যেখানে রাখা হয়েছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে। চাপ দেয়া হয়েছিল, আন্দোলন প্রত্যাহারের।
এই আয়নাঘরটিও কচুক্ষেত এলাকায় অবস্থিত। এখানে চারদিন আটকে রাখা হয়েছিল উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়াকে। তার ভাষ্যমতে, কক্ষটিকে এখন ভেঙ্গে বড় করা হয়েছে।
কচুক্ষেত এলাকার আয়নাঘরে গুম রাখা হয়েছিল জামায়াত নেতা গোলাম আযমের ছেলে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমান আযমীকে। পাশের কক্ষই ছিলেন বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী। পাশাপাশি ছিলেন- কিন্তু জানতেন না দু;জনের কেউ।
হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আমি কখনোই জানতাম না। আমি ওনার গলার আওয়াজ শুনতাম। শুনতাম উনি নামাজ পড়ছেন, কোরআন শরীফ পড়ছেন।’
সবকিছু ছাপিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আয়নাঘরের এই কক্ষগুলো কেন ভেঙ্গে ফেলা হলো? কিংবা কখন ভাঙা হলো? কেনই বা নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করো হলো?
হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আপনি যদি সুযোগ দেন অনেক মানুষই চাইবে জায়গাগুলো নষ্ট করি, প্রমাণগুলো নষ্ট করে ফেলি। আমরা এটা জানি একটা বিল্ডিং ভেঙে ফেলতে বেশি সময় লাগে না। এক রাতের মধ্যে হয়ে যায়। আমরা দেখেছি। এ বিল্ডিংটাকেও রাতারাতি ধ্বংস করে দেয়া যেত। ধ্বংস করা হয়নি। তার মানে কেউ না কেউ বাধা দিয়েছে। এটা প্রিজার্ভ করা হোক। যতটুকু এভিডেন্স আছে যথেষ্ট আছে।’
কতটা ভয়ংকর এসব আয়নাঘরের চিত্র, তা কেবল উপলব্ধি করেছে তারা, যারা দিনের পর দিন বন্দি থেকেছে আয়নাঘরের সরু অন্ধকার কক্ষে। তাই তো বিচারের দাবিতে অনড় অবস্থানে বন্দিশালার নির্মম নির্যাতনের শিকার সেই মানুষগুলো।