সেটা আজকের দিনে অবিশ্বাস্য গল্পের মতো মনে হবে, তবে সত্য এটাই যে–সেই ভয়াল মানচিত্রে পাকিস্তানি বাহিনী যে নির্মমতায় এদেশের নিরীহ মানুষ হত্যায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল সেটার নির্মোহ বর্ণনা পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। কারণ সেই অনউদ্ঘাটিত ইতিহাস সংরক্ষণের যে চেষ্টা স্বাধীনতার পরপরই হতে পারতো, সেটা তো হয়ই-নি বরং স্বাধীনতার পরপরই আওয়ামী দুঃশাসনে জনগণ ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত আগুনে পতিত হয়েছিল।
সেই অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতায় মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনার সঠিক বিবরণ সংগ্রহের চেষ্টা তেমন একটা যে ছিল না ইতিহাসই সেটার সাক্ষী। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইতিহাস বিকৃতির এক ঘৃণ্য চেষ্টা। এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে– যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে আওয়ামী লীগের গৌরবজনক তেমন কোন প্রত্যক্ষ অবদান ছিল না, সেকারণে আরোপিত ইতিহাস তৈরির একটা অপচেষ্টা হয়েছে, সেই অপরিপক্ব প্রচেষ্টা ইতিহাসকে বদলাতে তো পারেই-নি বরং সেটাকে আরও কলঙ্কিত করেছে। আর সে কারণেই আজকের তরুণ প্রজন্মে স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বিয়ে বিভ্রান্তিও কম নয়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো– আজ পর্যন্ত এদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন নির্ভুল তালিকা নেই, নেই শহিদদের তালিকা তৈরির নির্মোহ প্রচেষ্টা, এমনকি নেই বীরাঙ্গনাদের কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। যা আছে সেটা হলো বক্তৃতা নির্ভর কিছু সংখ্যা, যেটা বক্তৃতার জন্য সাময়িকভাবে কাজে লাগলেও ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি কখনোই।
অথচ বিপরীত চিত্রটির আবশ্যিকতা আর প্রয়োজন আর দুরভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে– যেমন স্বাধীনতা ঘোষণায় শহিদ জিয়ার প্রশ্নহীন বাস্তবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হয়েছে শেখ মুজিবের তথাকথিত ইপিআর এবং ওয়ারলেসের স্বাধীনতা ঘোষণার অবাস্তব, প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনার অবতারণা করে, যার কোন প্রয়োজন ছিল না, স্বাধীনতা ঘোষণার প্রকৃত ইতিহাসকে তার প্রাপ্য স্বীকৃতি দিয়ে সমস্যা কি ছিল সে প্রশ্নের উত্তর আজো অজানা।
শুধু সেটাই নয়, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ জিয়াকে পাকিস্তানি আইএসআই এজেন্ট বানানোর অপচেষ্টা, সেক্টর কমান্ডার জেড ফোর্স অধিনায়ক, বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত একজন দেশ প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র হনন করতে গিয়ে এই পতিত বুদ্ধিজীবীরা যে সমগ্র মুক্তিযুদ্ধকেই কলঙ্কিত করেছে, সেটা উপলব্ধি করার মত বাস্তব বুদ্ধিও এরা হারিয়ে ফেলেছিল।
এ দুর্বৃত্তরা এখানেই থেমে থাকেনি, স্বাধীনতার ঘোষণার এই বিকৃত ইপিআর কল্প-কাহিনীকে তারা সংবিধানে সংযুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি, এটাকে চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় করার মত অপচেষ্টাও করেছে।
অথচ আমরা একবারও কি ভেবে দেখেছি? ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে চট্টগ্রামে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটে কি অসম সাহসী ঘটনা ঘটছে একের পর এক? ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান যখন সে সময়ের মেজর জিয়াকে জানালেন ঢাকার পিলখানা, ইপিআর হেডকোয়ার্টার আর রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার আক্রান্ত হয়েছে পাকিস্তানীদের আকস্মিক আক্রমণে, চলছে নির্বিচার নৃশংস হত্যাকাণ্ড– তখন মুহূর্ত বিলম্ব না করে; কারো সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করে, কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে, শুধুমাত্র প্রশ্নহীন দেশপ্রেমকে শক্তি বানিয়ে ইউনিটে ফিরে একত্রিত বাঙালি সৈনিকদের সামনে দাঁড়িয়ে সুস্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন ‘উই রিভল্ট’– আমরা বিদ্রোহ করলাম।
কোনো অস্পষ্টতা নয়, কোনো শঙ্কা নয়, কোনো পরিণতি ভীতি নয়, সোজাসাপ্টা নিঃশঙ্ক উচ্চারণ–‘বিদ্রোহ করলাম’। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থায় তার জানার সুযোগ ছিল না জয়দেবপুরে মেজর শফিউল্লাহ কি করছেন, কুমিল্লায় খালেদ মোশারফ কিম্বা যশোরে মেজর আবু ওসমান। তিনি শুধু জানতেন তিনি একা, আর এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে ব্যর্থতার মানে–শত-শত সৈনিকের জন্য শুধু এবং একমাত্র পরিণতি–‘মৃত্যু’।
অধীনস্থ সৈনিকদের সুযোগ ছিল বিদ্রোহে শামিল না হবার, ক্যাপ্টেন খালিকুজ্জামান কিংবা ক্যাপ্টেন শওকত বা ক্যাপ্টেন অলি অথবা লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিন কেউ একবারের জন্যও প্রশ্ন তোলেননি সুসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর বিপরীতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা খণ্ডিত অংশ, যাদের হাতে মামুলি যুদ্ধাস্ত্র, কতোটা ভয়াবহ অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের, শুধু মাত্র অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস একজনের প্রতি, স্পষ্টভাষী জেদি আর সিদ্ধান্তে স্থির, রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর জিয়ার প্রতি।
প্রায় ৩০০ সৈন্য নিয়ে কালুরঘাট ব্রিজ পেরিয়ে কর্ণফুলীর ওপারে যাবার পথে ক্যাপ্টেন শমসের মুবিন আর ব্যাটালিয়নের হাবিলদারের জিজ্ঞাসা– ‘‘বেগম সাহেবকে বলে গেলেন না ?’’ স্মিত হাসিতে ছোট্ট উত্তর, তোমরা তো তোমাদের পরিবারকে বলে যাচ্ছ না, আমারই বা বলার দরকার কি?
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে সেই ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা, দিকভ্রান্ত, বিহ্বল, আক্রান্ত দেশবাসীর জন্য এক অসাধারণ অনুপ্রেরণার বার্তা, বেঁচে থাকা আর লড়াই করবার সঞ্জীবনী। সেটা যেমন সত্য, তেমনি আরেকটি সত্যকে আমরা হয়তো কখনোই অনুধাবন করিনি, এই প্রকাশ্য বেতারে ঘোষণার সাথেই তিনটি নিষ্পাপ প্রাণ অবারিত মৃত্যুর ঝুঁকির মুখোমুখি। বেগম জিয়া আর দু’টি শিশু– তারেক আর আরাফাত, সেই মুহূর্তে এদেশের সবচাইতে বিপদগ্রস্ত তিনটি বেসামরিক নাম।
জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না সত্যি, কিন্তু হৃদয় আর মননে স্বাধীনতার স্বপ্ন দীর্ঘদিন লালন না করলে অকস্মাৎ এমন সু-লিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া অসম্ভব। যে আওয়ামী নেতারা দেশের মানুষকে যার যা কিছু আছে সেটা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাদের কেউ কেউ তখন বিমানে পশ্চিম পাকিস্তানের পথে আর বাকিরা সীমান্ত পেরনোর প্রস্তুতিতে বর্ডারে পৌঁছে গেছে। পেছনে রেখে গেছেন কোটি কোটি নিরস্ত্র মানুষকে মৃত্যুর মুখে।
শহিদ জিয়া কখনো কারো দায়িত্বহীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি, কিন্তু ইতিহাসের তো কিছু সহজাত প্রশ্ন থাকেই। রাজনৈতিক নেতাদের কোন নির্দেশনা ছাড়া পাঁচ বছর আগে খেমকারান সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর লাহোর জয়ের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়া জিয়া কি ভেবে এমন দুঃসাহসিক কাজ করলেন? কিভাবে যুদ্ধের আগামী দিনগুলো পরিচালিত হবে, অস্ত্র গোলাবারুদ আর রসদই বা আসবে কোথা থেকে। জিয়া কি একাই যুদ্ধ করবেন? কতদিন চলবে এ যুদ্ধ? শেষ পরিণতি কি? স্বাধীনতার সমকালে এই আবশ্যিক প্রশ্নগুলো না তুলে স্বল্প ভাষী জিয়া রাজনীতির মহারথীদের একরকম করুণাই করে গেছেন।
জিয়া স্বপ্ন দেখতেন ঠিকই কিন্তু সেটা বাস্তবতাকে সাথে নিয়ে, তিনি জানতেন গেরিলা যুদ্ধে সমতলে পাকিস্তানিদের হারানো কঠিন, তাঁর গড়া নিয়মিত সেনাবাহিনী জেড ফোর্স ছিল যার অবধারিত পরিণতি। প্রবল ভারতীয় অনিচ্ছাকে অবজ্ঞা করে জেড ফোর্স এর জন্ম। কামালপুর, রৌমারী, সালুটিকরের যুদ্ধ আর ১২ ডিসেম্বর সিলেট মুক্তি ছিল জেড ফোর্স-এর সাহসী বীর গল্প গাঁথা।
এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের সম্মুখ সমরের এক অনন্য বীরত্ব গাঁথা। জিয়ার বীরোচিত ভূমিকা স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের আত্মত্যাগ আর যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণের প্রশ্নহীন ইতিহাস। যার সূচনা ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরের সাহসী ঘোষণা, বিদ্রোহ আর স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ আর যার সমাপ্তি বিজয় মুহূর্ত পর্যন্ত রণাঙ্গনে তার সরব উপস্থিতি।
জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণাকে ইতিহাস যতটা মর্যাদা দিয়েছে তার প্রাপ্য তার চাইতেও সহস্র গুণ বেশি। যে স্বাধীনতা যুদ্ধ একান্ত এদেশের মানুষের আত্মত্যাগের সাথে সমান্তরাল তার প্রকৃত অন্তর্নিহিত শক্তির সূচনা সেই মহান ঘোষণার গভীরে। ইতিহাসের কাছে দাবী রইল, আত্মত্যাগ আর বীরত্বের এই ঐতিহাসিক ক্ষণগুলো আরো সমৃদ্ধ করে নির্মোহ ভাণ্ডারে সংরক্ষণ করার।





