Recent event

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার অন্যতম মাপকাঠি

প্রফেসর ড. আবদুল আউয়াল খান
প্রফেসর ড. আবদুল আউয়াল খান | ছবি: এখন টিভি
2

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজালের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা আজ এক গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশ এখনও ব্যাপক খাদ্য দূষণের সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশে আজ এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে একজন ক্রেতা সে বাজারের যত ভালো জায়গা থেকেই খাদ্য পণ্য ক্রয় করুক না কেন মনের ভিতরে একটা সন্দেহ থেকেই যায় যে খাবারটা আসলেই নিরাপদ ও ভেজাল মুক্ত কিনা।

শিশু খাদ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের খাবারে ভয়ংকর রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার এখন আর নতুন কিছু নয়। এসব ভেজাল ও বিষাক্ত উপাদান আমাদের শরীরে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করছে, যার প্রভাব পড়ছে পুরো জাতির স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর। উচ্চবিত্তরা মানসম্মত আমদানিকৃত খাবারের দিকে ঝুঁকছে যেটা কিন্তু নিন্মবিত্তের ও মধ্যবিত্তের মানুষের নাগালের বাইরে।

২০২৪ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সূত্রমত ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, প্রায় ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ প্রতি বছর ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয় । প্রতিদিন দেশের প্রায় ৫ শতাংশ জনগণ ডায়রিয়া বা খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ও শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর একটি বড় অংশ অনিরাপদ খাদ্যের কারণে হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যের কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ, রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত, অপরিষ্কার পরিবেশে উৎপাদন, ইত্যাদি কারণে অন্ত্র, লিভার ও কিডনির সমস্যা, ক্যান্সারসহ নানা প্রাণঘাতী অসুখে প্রতিনিয়ত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এত কিছুর পরেও বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্যের রক্ষায় আইন ও নীতিমালার যথাযথ প্রয়োগ সন্তোষজনক বলে মনে হয় না।

খাদ্যে ভেজাল |ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংবিধান জনস্বাস্থ্য এবং পুষ্টিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(১) অনুযায়ী, জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসাবে বলা হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই জনগণের এই সাংবিধানিক অধিকারকে পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুসারে জীবন এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে সংরক্ষিত আছে। তাই নিরাপদ খাদ্যের অধিকারের সাথেই জীবনের অধিকার সম্পর্কিত। এই কারণে, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল প্রতিরোধে স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট, ১৯৭৪ আইনের ধারা ২৫সি অনুসারে খাদ্য, পানীয়, ঔষধ বা প্রসাধনীতে ভেজাল মেশানো বা বিক্রির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করেছে। এই আইন অনুসারে কেউ খাদ্য, পানীয়, ঔষধ বা প্রসাধনীতে ভেজাল মেশায় বা বিক্রি করে তাহলে অপরাধের মাত্রা ভেদে মৃত্যুদণ্ড, আজীবন কারাদণ্ড বা যে কোনো মেয়াদে কঠোর কারাদণ্ড যা ১৪ বছর পর্যন্ত হতে পারে।

২০১৩ সালে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করণে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং এই উদ্দেশে একটি দক্ষ ও কার্যকর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণীত হয়। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অপরাধের মাত্রা ভেদে সর্বনিন্ম ১ বছর থেকে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। জরিমানার পরিমাণ ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিধান রাখা হয়েছে। পুনরাবৃত্ত অপরাধের ক্ষেত্রে উল্লেখিত শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। শাস্তি ও জরিমানা যাই হোক না কেন আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে সমস্যার কখনও সমাধান হয় না।

নিরাপদ খাদ্য |ছবি: সংগৃহীত

এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যাবলীর ভিতরে রয়েছে খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা , খাদ্যের ভেজাল নিয়ন্ত্রণ ও মান নিরূপণ, আমদানিতব্য খাদ্যদ্রব্যের মানদণ্ড ও পরীক্ষণ, খাদ্যদ্রব্যে দূষিত বা রাসায়নিক বস্তুর উপস্থিতি বা মিশ্রণের প্রাদুর্ভাব ও ব্যাপকতা চিহ্নিতকরণ সহ জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে এই আইনের মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

এই আইনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা পরিষদ নামে একটি পরিষদ গঠন করা হয়েছে কিন্তু সেখানে সাধারণ জনগণ বা ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। নিরাপদ খাদ্য আইনের মাধ্যমে দৃশ্যমান যে পদক্ষেপ নেয়া হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু বেশিরভাগ মোবাইল কোর্ট ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে পরিচালিত হওয়ার কারণে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে সারাদেশে কার্যকর কোন প্রভাব ফেলছেনা। যার মফস্বল ও গ্রাম অঞ্চলে ভেজাল খাবার ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠী দারিদ্র সীমার নিচে অবস্থান করার কারণে সস্তা ও ভেজাল খাবারের অবৈধ সরবরাহ বন্ধ করা কঠিন হয়ে যায়। এজন্য সরকারকেই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে ভেজাল খাবারের প্রকৃতি ও এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নাই। সরকার ও সচেতন নাগরিকদের আইনের যথাযথ প্রয়োগে পরস্পরকে সহযোগিতা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর উপর ভিত্তি করে যে প্রণিধানমালা ও বিধিমালা প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিম্নমানের, ঝুঁকিপূর্ণ বা বিষাক্ত পদার্থযুক্ত খাদ্যদ্রব্য প্রত্যাহার প্রণিধানমালা, ২০২১, নিরাপদ খাদ্য (দূষণকারী জীবাণু নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ) প্রণিধানমালা ২০২১, নিরাপদ খাদ্য (খাদ্য ব্যবসায়ীর বাধ্যবাধকতা) প্রণিধানমালা ২০২০, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণ প্রণিধানমালা ২০১৭ ইত্যাদি।

তবে শুধু আইন দিয়েই এই সঙ্কট কাটানো সম্ভব না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ এখন প্রত্যাশা করে যে সরকার এই বিষয়ে আর প্রতীকী অভিযান বা খণ্ডকালীন মোবাইল কোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নিরাপদ খাদ্যের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ প্রক্রিয়াতে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক, পাইকার, পরিবহনকারী, আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতা—সকল পর্যায়ে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হলে ভেজাল বন্ধ করা সম্ভব নয়।

নিরাপদ খাদ্য |ছবি: সংগৃহীত

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে সুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা থাকবে। ভেজাল খাদ্যের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করবে। খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে অনেক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকে, যার ফলে আইন প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তারা বাধা সৃষ্টি করে।

নতুন সরকারের কাছে জনগণের স্পষ্ট দাবি থাকবে—আইনের প্রয়োগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পরিচয়, আর্থিক প্রভাব বা ক্ষমতার বলয় যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য সহজলভ্য করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্যর কারণে ভেজাল খাদ্যের অবৈধ বাজারের চাহিদা টিকে থাকে। সরকার ন্যায্যমূল্যে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ ব্যাপক হারে বাড়ানসহ,নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য শৃঙ্খলা বাহিনীর মত করে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে। উন্নত বিশ্বের দেশে যেমন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মডেল হিসাবে নিয়ে বৃহৎ পরিসরে স্বচ্ছতার মাধ্যমে ডিজিটাল সিস্টেমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করে ভেজালমুক্ত খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। খাদ্য ভেজাল রোধে শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, ব্যাপক জনসচেতনতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলাও জরুরি।

নতুন সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকবে—শিক্ষা কারিকুলামে নিরাপদ খাদ্য ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো এবং ভোক্তাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ও সহজ ব্যবস্থা চালু করা।

নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের অন্যতম প্রধান ও ন্যায্য প্রত্যাশা থাকবে—সবার জন্য ভেজালমুক্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা। এটা তাদের জন্য একটা নৈতিক পরীক্ষা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতার মাপকাঠি হিসাবে জনগণ মনে রাখবে।। জনগণ শুধুমাত্র আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু জনস্বাস্থ্য রক্ষা করবে না, বরং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। সরকারের পাশাপাশি আমাদেরকেও দায়িত্ব নিতে হবে যেন আগামী দিনটি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার দিয়ে শুরু করতে পারি।

লেখক: প্রফেসর ড. আবদুল আউয়াল খান

আইন বিভাগ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

ইএ