আজ (মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, ইলিশের দাম যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বহু বাইরে। প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায়, ছোট আকারের ইলিশও ১৮০০ টাকার নিচে নয়।
এক কেজির একটি মাছ কিনতেই খরচ প্রায় তিন হাজার টাকা, যা একটি নিম্ন বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক সপ্তাহের বাজারের সমান। ফলে একবেলার পান্তা-ইলিশ আয়োজনই হয়ে উঠছে বিলাসিতা।
এ বাস্তবতার গল্প শোনা যায় সাধারণ মানুষের মুখে। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আবিদ ছেলের আবদারে বাজারে এলেও শেষ পর্যন্ত ইলিশ কেনা তার জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বেসরকারি চাকরিজীবী আসিফ হোসেনের ভাষ্য, ‘ইলিশ এখন আর ঐতিহ্য নয়, এটা প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে।’ তাদের মতো অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবার উৎসবের আনন্দ আর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মাঝে আটকে পড়ে প্রতিনিয়ত।
রাজধানীর বাইরেও একই চিত্র। বরিশাল, পাথরঘাটা কিংবা আলীপুর-মহিপুরের মোকামগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম আরও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশাখকে কেন্দ্র করে মজুতদারি, জ্বালানি সংকট এবং কম সরবরাহ; সব মিলিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর পেছনে রয়েছে বড় একটি বাস্তবতা, ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়া। সাম্প্রতিক অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় পাঁচ লাখ টনে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। নদী ভরাট, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত আহরণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি মাছের গড় আকারও ছোট হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাটকা নিধন, অবৈধ জাল ব্যবহার এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতেও ইলিশের প্রাপ্যতা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন এক চিত্র; সাজানো পান্তা-ইলিশ, হাসিমুখে ছবি, উৎসবের রঙিন ফ্রেম। কিন্তু এই দৃশ্য অনেকের জন্য অপ্রাপ্তির বেদনাও বাড়িয়ে দেয়। যারা সামর্থ্যের অভাবে ইলিশ কিনতে পারেন না, তাদের কাছে এটি হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য চাপ।
পহেলা বৈশাখ যে দিনটি সাম্য, সম্প্রীতি ও একতার বার্তা নিয়ে আসে; সেই দিনেই যখন বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে; তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কী ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে পারছি, নাকি সেটিকে ধীরে ধীরে বিলাসিতায় পরিণত করছি? বৈশাখের প্রকৃত চেতনা কি পান্তা-ইলিশে, নাকি মানুষের মিলন আর আনন্দে; এ প্রশ্নই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।





