পেস্ট্রি কিনতাম সন্ধ্যার নাস্তার জন্য। সেই পেস্ট্রি পেস্ট্রিটা হয়তো দুই সপ্তাহ না কিনে মাসে একবার কিনছি, হ্যাঁ। যে আইটেমগুলো বাচ্চারা পছন্দ করে আসলে ফ্রাই আইটেম, সেই ফ্রাই আইটেমটা আমি কমিয়ে ফেলেছি—এসব কথা বলেন একজন ক্রেতা।
একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত সংসারের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি যেন এটি। মাসের শুরুতে বাজারে ঢুকে ব্যাগ ভরার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে আয়ের বড় অংশ। চাল, আটা, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে রান্নার এলপিজি—সবখানেই চলছে বাড়তি দামের প্রতিযোগিতা। বাধ্য হয়ে কাটছাঁট করতে হচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবারের মতো মৌলিক খরচে।
বিক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘১০০০ টাকা নিয়ে আসছে, সে তেল তেলই কিনবে ৫ লিটার না ২ লিটার কিনবে না আলু কিনবে না পেঁয়াজ কিনবে, এর মধ্যেই শেষ।’
প্রতিদিনের এই বাড়তি চাপ কীভাবে সামাল দিচ্ছে সাধারণ মানুষ? হিসাব বলছে, সংসার বাঁচাতে মানুষ এখন বাধ্য হয়ে সংকুচিত করছে তাদের জীবনযাপনের পরিধি।
আরও পড়ুন:
ক্রেতাদের মধ্যে একজন বলেন, ‘ফল কিনে নিয়ে যাও ফ্যামিলির জন্য। এইটার আগের মতো আর করার সম্ভব হয় না। ইদানিং সে ইফেক্টটা এমনভাবে পড়ছে আমার শেষের দিকে আসে, মানে খরচ করার মতো আর টাকা নাই।’
ব্যবসায়ীদের দাবি, বিশ্ববাজার ছাড়াও পরিবহন আর জ্বালানির বাড়তি খরচ সরাসরি প্রভাব ফেলছে নিত্যপণ্যে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বারবার সতর্কতার পরও জীবনযাত্রার নানামুখী ব্যয়ের চাপে বাজারে স্বস্তি ফিরছে না।
উল্টো পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত অতিরিক্ত মুনাফা পকেটে পুরছে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট।
ক্যাবের মহাসচিব অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বলেন, ‘শুধু অসৎ ব্যবসায়ীদের কারণে, তাদের যে একটা অবৈধ সিন্ডিকেট, এইটা কোনো সরকার এইটাকে ভাঙল না। এক টাকা বাড়তে পারে। অথচ তারা কিন্তু আমাদের পণ্যের দাম নিচে ১০ টাকা বাড়াইয়া। আমরা কারণ বাজারের কথা যদি বলি যে পণ্যটা কারণ বাজারে আইসা ২০ টাকা কেজিতে পৌঁছলো, এইটা যখন কারণ বাজারের দক্ষিণ গেট অর্থাৎ সোনারগাঁ হোটেলের সামনে ঢোকে, এইটা এখান থেকে গিয়া সামনে একটু হাতিরপুলে গেলে এটা ২০ টাকা বেড়ে গেছে। ২০ টাকা যদি কেজি হয়ে থাকে তো এইটা আরও ২০ টাকা বাইড়া গিয়া এটার দাম ধরেন তারা ৪০ টাকা। তো ৪০ টাকা যে নিয়ে এটা হাতিরপুল বাজারে এনে বিক্রি করতেছে, এইডা সে আবার ২০ টাকা লাভ করে।’
কেবল খাবারের তালিকায় আপস নয়, নিত্যপণ্যের বোঝা বইতে গিয়ে অনেকেই পিছিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন নিজের কিংবা পরিবারের জরুরি চিকিৎসা সেবা।
রোগীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘চিকিৎসার খরচ তো ফিক্সড, এটা তো আসলে ইয়া করা যাচ্ছে না। এই মাস না পরের মাস করলাম কিছু সঞ্চয় করে পরে করলাম—এরকম চিন্তা ভাবনা করা লাগতেছে।’
আরও পড়ুন:
অর্থনীতিবিদদের মতে, টানা কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগকে যেমন স্থবির করে দিচ্ছে, তেমনি সংকুচিত করছে কর্মসংস্থানের পথ, যার মারাত্মক ধাক্কা পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।
ঢাবি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘যদি এই ধরনের কনসিকুয়েন্স দীর্ঘদিন যাবত হয়, তখন অনেক বাচ্চা স্কুল থেকে ঝরে পড়ে, শিশুশ্রমে নিযুক্ত হয়। আবার অনেকেই যারা টিউশন, প্রাইভেট টিউশনের মানে শিক্ষা দেয় বাচ্চাকে, অনেকের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করে দেয়। অতএব শিক্ষা বলেন এবং স্বাস্থ্য বলেন সমস্ত কিছুর ওপরই কিন্তু এর একটা প্রভাব রয়েছে। আরেকটা বড় প্রভাব হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আমাদের বিনিয়োগ বাড়ার যে একটা সম্ভাবনা ছিল, সেটাই তো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপে কারসাজি আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা না গেলে সীমিত আয়ের মানুষের এই নীরব হাহাকার থামানো অসম্ভব। বাজার তদারকি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর প্রয়োগই এখন সময়ের দাবি।





