আজ (বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হয়। পরে নির্বাচনি কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।
মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। অসুস্থতার কারণে বিএনপির সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস ভোট দিতে পারেননি। আদালতের রায়ে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ায় আসলাম চৌধুরীও ভোট দিতে পারেননি। আর অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তার ভোটাধিকার ছিল না। এছাড়াও ভোটদানে বিরত থাকেন আরও ৬ সংসদ সদস্য।
আরও পড়ুন:
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ও তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুদ্দোজা হায়দার চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এরপর পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।
ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার আবার রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোট হলো।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একাধিকবারের সংসদ সদস্য এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী। মা মির্জা ফাতেমা আমিন।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন মির্জা ফখরুল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে হাতেখড়ি তার। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কারাগারেও যেতে হয় তাকে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে মন্ত্রী
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দলের সাংগঠনিক পথেও দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। চেয়ারপারসন ও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতে দলকে আগলে রেখেছেন একহাতে দীর্ঘ ১৭টি বছর।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বঙ্গভবনে শপথ শুক্রবার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এখন বঙ্গভবনে শপথ নেয়ার অপেক্ষা মির্জা ফখরুলের। আগামীকাল (শুক্রবার, ২১ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে তার শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শপথের পর আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দ, তবে নৈকট্য হারানোর আক্ষেপ
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দের পাশাপাশি আবেগও তৈরি হয়েছে।
তার বন্ধু ও ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, তার বন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করবেন—এটি দেশবাসীর জন্য গর্বের। তবে রাষ্ট্রপতি হলে ঠাকুরগাঁওবাসী তার নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হবেন, এটিও আক্ষেপের।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মির্জা ফখরুল তার অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের জন্য কাজ করবেন, এটাই তাদের প্রত্যাশা।
‘জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়াই আমার প্রত্যাশা’
আলাপকালে মির্জা ফখরুল ইসলাম প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘তিনি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে প্রান্তিক মানুষ, খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবীরা দুই বেলা পেট ভরে খেতে পারবেন এবং নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বসবাস করতে পারবেন।’ পাশাপাশি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বুকে আমরা বাংলাদেশিরা একটি আত্মমর্যাদাশীল দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিত করব। আমি বিশ্বাস করি ও প্রত্যাশা করি, তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাংলাদেশ একটি জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।’
দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মির্জা ফখরুল মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া আদায় করেন। অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামে পাশে থাকা দেশবাসী, গণমাধ্যমসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তার নেতৃত্বেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের গন্তব্যে দেশ পৌঁছাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
এসময় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অনেক কিছু মিস করব, যা স্মরণ করলে আমি আবেগকে ধরে রাখতে পারছি না।’ সবাইকে ভালো, সুস্থ ও নিরাপদ থাকার পাশাপাশি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকের এই দিনে আমার সবচেয়ে বেশি যার কথা মনে পড়ে এবং যার কথা মন কাঁদায়, তিনি হলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।’ খালেদা জিয়ার সান্নিধ্য ও স্নেহ পাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তার কথা মনে পড়লে এখনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো বঙ্গভবনে। ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার হাতে উঠলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব।




