সরকার কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক চাপে নেই: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান | ছবি: সংগৃহীত
0

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, সরকার কোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক (জিওপলিটিক্যাল) চাপ বা সংকটে নেই। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আজ (মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট) সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা মার্কিন কূটনীতিকের ভারত সফর কিংবা ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে বৈঠককে কেন্দ্র করে নানা ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। তবে এটি একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। ওই কূটনীতিক ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাই বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখার কোনো কারণ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, রাশিয়া ও ইরানসহ সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। আগের সরকারের মতো ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নয়, বরং জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট বাস্তবায়নেই সরকার কাজ করছে।’

এসময় আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোনো গণমাধ্যম শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা। বলেন, ‘আগেও এ বিষয়ে গণমাধ্যমের জন্য সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। যদি কেউ আগাম প্রচার করে যে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেবেন এবং সেটি প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, তবে সেটি আদালতের আদেশ অমান্যের শামিল হবে।’

তিনি যোগ করেন, ‘আমরা আবারও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেব, কেউ যেন এ ধরনের কাজ না করেন। আদালতের নির্দেশনা মানা প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। সরকারের কাজ হলো আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আদালতের আদেশ না থাকলে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে বাধা দেয়া ঠিক হতো না। কেউ যদি আদালতের ওই আদেশের সঙ্গে একমত না হন, তাহলে তিনি আদালতেই গিয়ে সেই রায় চ্যালেঞ্জ করতে পারেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আদালতের আদেশ বহাল থাকবে, ততক্ষণ সেটি সবাইকে মেনে চলতে হবে।’

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ বৃহস্পতিবার জামিন পাওয়ার তথ্য সরকার দুই-তিন দিন পর জানল কেন— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না।

তিনি মন্তব্য করেন, ‘আমি বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেব এবং তার সঙ্গে কথা বলব। কেন এ ধরনের গ্যাপ হয়েছে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।’

প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখনো আগের সরকারের প্রভাব রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ও দেশত্যাগ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে ১৫ বছর ধরে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের সবাইকে এক দিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’

দেশের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে প্রশাসনসহ নানা প্রতিষ্ঠানে আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানুষ এখনো রয়েছেন। চাইলেই এত মানুষকে একসঙ্গে সরিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। ১৫ বছরে বিভিন্ন স্তরে যারা উঠে এসেছেন, তাদের পরিবর্তে নতুনদের আনতে সময় লাগে, যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘শুধু বদলি করলেই হবে না, নতুন কর্মকর্তাদের দক্ষতা অর্জনেরও বিষয় রয়েছে। সরকার ধীরে ধীরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করছে, তবে এমনভাবে নয় যাতে রাষ্ট্রের সেবাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।’

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা যোগ করেন, ‘চেষ্টা শুধু নয়, কাজও চলছে। তবে এমনভাবে পরিবর্তন করা হচ্ছে না, যাতে ভঙ্গুর সিস্টেম আরও ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রেখেছে। তিনি দেশে ফিরলে তাকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করা হবে এবং একজন আসামি হিসেবে তার প্রাপ্য সব আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হবে। আদালত যে রায় দেবেন, সরকার তা মেনে নেবে। সরকার তো তাকে ফিরিয়ে আনতেই চায়। এজন্য ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে একই বার্তা দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। এরপর তিনি আইনজীবী নিয়োগ, আত্মপক্ষ সমর্থনসহ আইনে নির্ধারিত সব সুযোগ পাবেন। সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাস করে এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে এক প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাহেদ উর রহমান উল্লেখ করেন, ‘অতীতেও তার বিভিন্ন আহ্বানের বাস্তব কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। এখনো কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাকে সমর্থন করতে পারেন কিংবা অতীতের সুবিধাভোগী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে পারেন। তবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে সরকারকে চ্যালেঞ্জ দেয়ার মতো নৈতিক বা সাংগঠনিক শক্তি তাদের নেই।’

শেখ হাসিনার দেশত্যাগে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এই মুহূর্তে কারা কীভাবে ওই ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তা নিয়ে তদন্তের কোনো উদ্যোগ সরকারের নেই।’

নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনের দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তাকে দেশে আনার জন্য সরকারের কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেই। তিনি যদি দেশে ফিরতে চান, তাহলে প্রচলিত আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আবেদন করতে পারবেন। এরপর সরকার আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।’

তসলিমা নাসরিন অতীতে যাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন সেই বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ‘তিনি যদি দেশে ফিরে আদালতের আশ্রয় নিতে চান, তাহলে আইন অনুযায়ী সেই সুযোগ পাবেন। ফৌজদারি অপরাধ তামাদি হয় না। ভুক্তভোগী হিসেবে তিনি চাইলে আদালতে মামলা করতে পারবেন।’

এএইচ