যেকোনো শিল্পে বিনিয়োগ করলে পুঁজি তুলে আনা বা রিটার্ন পেতে সময় লাগে। তবে জাহাজ পরিচালনা ব্যবসা এদিক থেকে ভিন্ন। বর্তমানে এ খাতের পরিধিই শুধু বাড়ছে না, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে বেড়েছে আয়ও। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে গেল দু’বছরে এ খাতে বিনিয়োগ কমেছে।
২০২৪ এর জুনে দেশিয় পতাকাবাহী জাহাজ শতকের মাইল ফলক অতিক্রমের পর দুই বছরে যুক্ত হয়েছে মাত্র ১১টি জাহাজ। বিশ্বের বন্দরে বন্দরে লাল সবুজের পতাকা উড়াচ্ছে বর্তমানে ১০৮টি জাহাজ। নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে আরও কয়েকটি।
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের মুখ্য কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেখ মো. জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, ‘গোটা বিশ্বজুড়ে যে একটা জিওপলিটিক্যাল আনসার্টেনিটি বা ভোলাটিলিটি যেটাই বলেন না কেন, সেটার কারণে একটা ট্রেড এবং এই যে শিপিংয়ে একটা ডেফিনেটলি একটা আনসার্টেনিটি তৈরি হয়েছে। সেই কারণে আসলে সবাই ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে হয়তো একটু ওয়েট অ্যান্ড সি—এই পলিসিতে যাওয়ার কারণে হয়তো খুব বেশি ওরকম আশানুরূপ হচ্ছে না।’
এক সময় বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন সর্বোচ্চ ৩৪টি সমুদ্রগামী জাহাজের মালিক থাকলেও বর্তমানে বেসরকারি খাতই এ ব্যবসায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০১৯ সালে সরকার জাহাজ কেনায় শুল্ক করে ব্যাপক ছাড় দেয়ার পর বাড়তে থাকে দেশিয় পতাকাবাহী জাহাজ।
আরও পড়ুন:
গত সাত বছরে বিএসসিসহ বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ জাহাজ কিনেছে ৯০টি। ২০২০ ও ২০২২ সালে জাহাজ কেনা হয়েছে রেকর্ড ১৫টি করে। সবশেষ গত ছয় মাসে দেশিয় পতাকায় জাহাজ যুক্ত হয়েছে সাতটি।
২৭টি জাহাজ নিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজের মালিকানায় বর্তমানে যৌথভাবে শীর্ষে আছে কেএসআরএমএম গ্রুপের মালিকানাধীন এসআর শিপিং ও মেঘনা গ্রুপ। ১১টি জাহাজ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আকিজ গ্রুপ, ৮টি জাহাজ নিয়ে এইচআর শিপিং তৃতীয় ও ৭টি জাহাজ নিয়ে যৌথভাবে চতুর্থ অবস্থানে বিএসসি ও ভ্যানগার্ড।
যদিও সার্ভেয়ারের উচ্চ সুপারভিশন ফি ও বাংলাদেশি নাবিকদের ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতা দেশিয় পতাকায় জাহাজ ক্রয় ও পরিচালনায় অন্যতম বাধা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মেঘনা গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আবু তাহের বলেন, ‘আমরা যেটা চ্যালেঞ্জিং এখন ফেস করতেছি, বিভিন্ন দেশে আমাদের ভিসা সমস্যার কারণে আমাদের এখন অনেক জায়গায় ট্রেড করতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। তো যার ফলে আমরা সরকারের কাছে যদি আইনগতভাবে এটা লেখা ছিল, কিন্তু এটা কোনো ক্লিয়ার কোনো ইন্ডিকেশন ছিল না যে কত পারসেন্ট কীভাবে নেয়া হবে। আমরা মাঝেমধ্যে কোনো ক্রাইসিসে পড়ে নিতে গেলেও এটা আমাদের সরকারের কাছে অনেক মানে টাইম কনজিউমিং।’
শতক ছড়ালেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে দেশিয় জাহাজে পর্যাপ্ত নয় । ফলে প্রতি বছর জাহাজ ভাড়া বাবদ প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। দেশি পতাকায় জাহাজ ক্রয়ে উৎসাহী করতে স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রণোদনা দেয়ার আহ্বান সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আনাম চৌধুরী বলেন, ‘আপনি যদি ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ ক্যারি করেন, আপনারা যদি হায়ার অ্যামাউন্ট অব গ্রস টন ক্যারি করেন, সেই গ্রস টন অনুযায়ী একটা প্রণোদনা দিত। আপনি যদি এখানে বাংলাদেশি সিফেয়ারার এমপ্লয় করেন, সেখানে একটা প্রণোদনা দিত, বার্থিং ফ্যাসিলিটিজ দিতে হবে, যা গ্লোবালি সবাই দিচ্ছে। এখন এটা না দিলে আপনি ব্যবসায়ীদেরকে উদ্বুদ্ধ না করলে আপনি কোনোদিন এই বিজনেসকে মানে এক্সপ্যান্ড করতে পারবেন না। এদেরকে এনকারেজ করতে হবে, গভর্মেন্টকে সফট লোন দিতে হবে। যে একটা লোন ধরেন আপনি ১৫ বা ২০ বছরের জন্য আপনি দিলেন, তিন শতাংশ ইন্টারেস্টে দেন, ব্যবসায়ীরা সবাই এটা এভেল করবে।’
সমুদ্রগামী জাহাজ ব্যবসায় মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আইন-কানুনে শিথিলতা ও কর দিতে না হওয়ায় পানামা ও বারমুডাসহ অন্যান্য দেশের পতাকায় আছে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি জাহাজ।





