২৩ অক্টোবর ২০২৩, কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা এগারসিন্দুর গোধূলি ট্রেনের সঙ্গে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মালবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ। এ ঘটনায় নিহত হয় নারী শিশুসহ ১৮ জন। তদন্তে দুর্ঘটনার কারণ উঠে আসে সিগনাল অমান্য, ক্রসিং পয়েন্টে ভুল এবং চালকদের গাফিলতি।
আর চলতি বছরের ২২ মার্চ কুমিল্লার পাদুয়ার বাজার রেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে নিহত হয় ১৩ জন। এ দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্টেও উঠে আসে সিগন্যাল ভুলের তথ্য, ছিলো গেটম্যানের গাফিলতিও।
শুধু কিশোরগঞ্জ কিংবা কুমিল্লাই নয়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রেলের দুর্ঘটনা প্রায় ৭০০, আর এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা কয়েকশো এবং আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে হাজারের ঘর। এখন প্রশ্ন হলো, কেন রেলে এত দুর্ঘটনা?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দুর্ঘটনার সিংহভাগের কারণ দেশে বিদ্যমান রেল সিগন্যাল ব্যবস্থা ও অপরিকল্পিত রেল ক্রসিং। তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে ৫ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা দিয়ে চলছে রেল চলাচল। এর মধ্যে কম্পিউটারাইজড রিলে ইন্টারলকিং সিস্টেম আধুনিক হলেও, বাকি সবই মানদাতার আমলের। এখনো কোনো কোনো রেলস্টেশনে হাত দিয়ে তৈরি করা হয় সিগন্যাল। হ্যারিকেন সিগন্যাল ব্যবস্থাও বিদ্যমান।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমাদের এখনো অনেক জায়গায় কিন্তু সেমাফোর সিগনাল বসে আছে। কিছু সেকশনে আবার মর্ডান কালার লাইটও (রেড-ইয়োলো-গ্রিন) আছে। তার মানে, প্রথম কথা হচ্ছে একজন লোকমাস্টার বিভিন্ন সেকশনে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের সিগনালিং সিস্টেম দেখেন, যেটা তাকে বিভ্রান্ত করে।’
গাজীপুর কালিয়াকৈর উপজেলার ভাউমান টালাবহ রেলক্রসিংয়ের দু’পাশে ৬ গ্রামে অন্তত ২০ হাজার মানুষের বসবাস। একইসঙ্গে এ ক্রসিংয়ের একপাশে আছে একটি উচ্চবিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে এ রেল ক্রসিং পার হলেও, ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেটম্যান বা ব্যারিয়ার।
আরও পড়ুন:
রেলওয়ে তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে রেল ক্রসিং আছে প্রায় ৪ হাজার ১৬০টি। এর মধ্যে ২ হাজার ক্রসিং নিরাপত্তা থাকলেও অরক্ষিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০। আর অবৈধ ক্রসিং আছে ৮৫৪টি। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। আর এসব রেল ক্রসিং রক্ষায় অসহায় কতৃপক্ষ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী সৈয়দ মো. শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিদিনই দেখা যাবে কোনো না কোনো গ্রামাঞ্চলে একটা নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। আসলে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে এই প্রতিটি ক্রসিংয়ে এককভাবে নিরাপত্তা দেয়াটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বর্তমানে রেলের গড় গতি মাত্র ৭০ কিলোমিটার। রেল সিগন্যাল ও ক্রসিং আধুনিকায়ন করা গেলে এ গতি ছাড়াবে শতকের ঘর, এছাড়া কমবে রেল দুর্ঘটনাও।
ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমি যদি দুর্ঘটনা কমাতে চাই, তার মানে ঝঁকি কমাতে হবে; এবং যদি গতি বাড়াতে চান, যেহেতু সেবা বাড়াতে হবে, সেক্ষেত্রে আসলে আধুনিকায়নের পথেই আমাদের হাঁটতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘লেভেল ক্রসিংয়ের যে গেটগুলো আছে, সেগুলো যদি ইন্টারলক করে দেয়া যায়, তাহলে এখানে আসলে গেটম্যানেরও প্রয়োজন হবে না।’
রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নের পাশাপাশি ক্রসিং নিয়ে নতুন পরিকল্পনা চলছে। বাস্তবায়ন হলে ট্রেন আসার আগাম বার্তা পাওয়া যাবে দেশের সব রেল ক্রসিংয়ে।
বছরের পর বছর রেলের আইন কিংবা উদ্যোগ কেতাবে থাকলেও বাস্তবে খুব দেখা মেলে না। ফলে এবারের উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হবে— সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।





