আজ (বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি) ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ‘নো ইওর ক্যান্ডিডেট (কেওয়াইসি)’ ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন উপলক্ষে এসব তথ্য তুলে ধরে টিআইবি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামানসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বিদেশে সম্পদ গোপনের অভিযোগ
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী প্রার্থীদের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে, তা ঘোষণা করা বাধ্যতামূলক। এবারের নির্বাচনে ২১ জন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ ও ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও অন্তত দুজন প্রার্থী তাদের দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেননি বলে দাবি টিআইবির।
আরও পড়ুন:
এছাড়া, এক প্রার্থীর নির্ভরশীলের নামে যুক্তরাজ্যে ২০১৩ সালে কেনা প্রায় ১.৪ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ২১০ কোটি টাকা) মূল্যের বাড়ির তথ্য হলফনামায় নেই। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে সম্পদ থাকার কথা অস্বীকার করলেও তার স্ত্রীর নামে দুবাইয়ে ফ্ল্যাটের মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে। একজন প্রার্থী বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাটের মালিকানা স্বীকার করলেও প্রকৃত সংখ্যা কমপক্ষে তিনগুণ এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে টিআইবি। এমনকি, করস্বর্গে কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্যও কিছু প্রার্থী গোপন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
যাচাই সক্ষমতার অভাব ও জবাবদিহির ঘাটতি
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যাপক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। প্রদর্শিত সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, আয়-সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না এবং প্রদেয় কর বাস্তবসম্মত কি না—এই তিনটি বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি। কিন্তু কার্যত এর কোনোটিই হয় না।’
তিনি নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগকে সমন্বিতভাবে এসব তথ্য যাচাই করে সময়োচিত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।
নারী প্রতিনিধিত্বে হতাশা, ইসলামপন্থি দলে নারী নেই
টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দলের মোট প্রার্থী ১ হাজার ৯৮১ জন। এর মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী। মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশের বেশি ইসলামপন্থি দলগুলোর, যা বিগত পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ ইসলামপন্থি দলের একজনও নারী প্রার্থী নেই।
আরও পড়ুন:
সামগ্রিকভাবে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারী মাত্র ৩.৩৮ শতাংশ, যেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে নারী প্রার্থী ১০ শতাংশ। টিআইবির মতে, এটি প্রমাণ করে যে যোগ্য নারী প্রার্থীর অভাব নয়, বরং দলীয় রাজনীতির ক্ষমতাকেন্দ্রিক কাঠামোই নারীদের মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত করছে।
ব্যবসায়ী প্রার্থী ও কোটিপতির আধিক্য
প্রার্থীদের পেশা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী ব্যবসায়ী। আইন পেশা ও শিক্ষকতা যথাক্রমে ১২.৬১ ও ১১.৫৬ শতাংশ। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন মাত্র ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী।
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের হিসাবে ৮৯১ জন প্রার্থী কোটিপতি। এর মধ্যে ২৭ জনের সম্পদ শতকোটি টাকার বেশি। মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশের ঋণ বা দায় রয়েছে, যার পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
আরও পড়ুন:
মামলা ও ব্যয়ের চিত্র
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। অতীতে মামলা ছিল ৭৪০ জনের বিরুদ্ধে। এবারের নির্বাচনে ঘোষিত মোট নির্বাচনি ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা। দলভিত্তিক ব্যয়ে শীর্ষে বিএনপি (১১৯.৫ কোটি টাকা) এবং দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (৮০.৬ কোটি টাকা)।
ভোটার সচেতনতাই লক্ষ্য
টিআইবি জানায়, এই বিশ্লেষণ ও ‘নো ইওর ক্যান্ডিডেট’ ড্যাশবোর্ডের মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে হলফনামার তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করতে উদ্বুদ্ধ করা। ড্যাশবোর্ডের (https://www.ti-bangladesh.org/kyc) মাধ্যমে দল ও আসনভিত্তিক প্রার্থীদের তুলনামূলক চিত্র দেখা যাবে।




