একনজরে দ্বিতীয় বিয়ের আইনি বিধান ও হাইকোর্টের রায়
- হাইকোর্টের রায়: ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনের ৬ ধারা (বহুবিবাহের বিধান) বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আগের আইনটিই বহাল আছে, কোনো পরিবর্তন হয়নি।
- অনুমতি কার লাগবে: দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রধানত সালিস পরিষদের (Arbitration Council) লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক।
- আবেদন প্রক্রিয়া: স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বা মেয়রের কাছে নির্ধারিত ফি-সহ আবেদন করতে হবে।
- স্ত্রীর ভূমিকা: আবেদনের সময় স্ত্রীর সম্মতি আছে কি না তা জানাতে হয় এবং সালিস পরিষদে স্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন।
- সালিস পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান, স্বামীর প্রতিনিধি এবং স্ত্রীর প্রতিনিধির সমন্বয়ে এই পরিষদ গঠিত হয়।
- শাস্তি: অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে ১ বছর পর্যন্ত জেল অথবা ১০,০০০ টাকা জরিমানা (বা উভয় দণ্ড) হতে পারে।
- দেনমোহর: অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (নগদ ও স্থগিত) তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে স্বামী বাধ্য থাকেন।
- মূল কথা: শুধু স্ত্রীর মৌখিক অনুমতি যথেষ্ট নয়, আইনিভাবে সালিস পরিষদের ছাড়পত্র ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা অপরাধ।
আরও পড়ুন:
রিট আবেদনের প্রেক্ষাপট ও হাইকোর্টের রায় (High Court Verdict & Background)
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারার (Section 6 of Muslim Family Laws Ordinance 1961) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে একটি রিট আবেদন করা হয়। রিটকারীর দাবি ছিল, বহুবিবাহের (Polygamy) ক্ষেত্রে বর্তমান স্ত্রীদের সম-অধিকার ও ভরণপোষণ নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।
তবে চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুলটি খারিজ (Rule Discharged) করে দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, বিদ্যমান আইনের ৬ ধারা কোনোভাবেই নারী বা পুরুষের মৌলিক অধিকার (Fundamental Rights) খর্ব করে না। ফলে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে আগের আইনটিই বহাল থাকল।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় বিয়েতে কার অনুমতি নিতে হবে? (Whose Permission is Required)
প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় পুনরায় বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবশ্যই সালিস পরিষদের (Arbitration Council) লিখিত পূর্বানুমতি নিতে হবে।
অনুমতি প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ:,
- আবেদনকারীকে নির্ধারিত ফি-সহ স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করতে হবে।
- আবেদনে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণ এবং বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি (Consent of Existing Wife) নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ করতে হবে।
- চেয়ারম্যান আবেদনকারী এবং বর্তমান স্ত্রী—উভয় পক্ষকে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন।
- এই সালিস পরিষদ যদি মনে করে প্রস্তাবিত বিয়েটি ‘প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত’ (Necessary and Just), তবেই শর্তসাপেক্ষে অনুমতি মঞ্জুর করবে।
আরও পড়ুন:
অনুমতি ছাড়া বিয়ের শাস্তি (Punishment for Illegal Polygamy)
যদি কোনো ব্যক্তি সালিস পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ (Marriage without Permission) করেন, তবে তাকে কঠোর পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে:
দেনমোহর পরিশোধ: বর্তমান স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (Dower Money) তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে।
কারাদণ্ড ও জরিমানা: অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড (Imprisonment) অথবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
আইনজীবীর ব্যাখ্যা: স্ত্রীর অনুমতি কি বাধ্যতামূলক?
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান জানান, ‘অনেকে ভুল ব্যাখ্যা দেন যে শুধু স্ত্রীর অনুমতিই যথেষ্ট। আসলে আইন অনুযায়ী প্রধানত আরবিট্রেশন কাউন্সিল বা সালিস পরিষদের অনুমতি নিতে হয়। কাউন্সিল স্ত্রী বা স্ত্রীদের বক্তব্য শুনবেন এবং আবেদনকারীর আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত দেবেন।’ হাইকোর্ট আগের এই আইনি বিধানটিই বহাল রেখেছেন, নতুন কোনো নিয়ম দেননি।
আরও পড়ুন:
দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে দেনমোহর আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬(৫) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি সালিস পরিষদের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তার বর্তমান স্ত্রীর জন্য বিশেষ কিছু আইনি অধিকার তৈরি হয়:
তৎক্ষণাৎ পরিশোধ (Immediate Payment): স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর (তলবি বা মুয়াজ্জাল এবং স্থগিত বা মুআজ্জাল—উভয় অংশই) তৎক্ষণাৎ পরিশোধযোগ্য হয়ে যায়। স্ত্রী দাবি করা মাত্র স্বামী তা দিতে বাধ্য।
বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়: যদি স্বামী স্বেচ্ছায় দেনমোহরের টাকা না দেন, তবে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে তা 'বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে' (Arrears of Land Revenue) আদায়ের আবেদন করতে পারেন। এটি দেনমোহর আদায়ের একটি দ্রুত ও কঠোর পদ্ধতি।
পারিবারিক আদালতে মামলা: স্ত্রী চাইলে স্থানীয় পারিবারিক আদালতে (Family Court) দেনমোহর আদায়ের জন্য দেওয়ানি মামলা করতে পারেন।
বিয়ের বৈধতা বনাম দেনমোহর: মনে রাখবেন, অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিয়েটি বাতিল হয়ে যায় না, তবে সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিয়ে বহাল থাকলেও স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করার আইনি অধিকার হারান না।
আরও পড়ুন:
সালিস পরিষদ (Arbitration Council) গঠনের নিয়মাবলী
দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি বা পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিস পরিষদ গঠন একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া। এর গঠন কাঠামো নিচে দেওয়া হলো:
পরিষদের প্রধান (The Chairman): সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর এই পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিনিধি মনোনয়ন (Representation): আবেদনকারী (স্বামী) তার পক্ষে একজন প্রতিনিধি মনোনীত করবেন।
- বর্তমান স্ত্রী (বা স্ত্রীগণ) তাদের পক্ষে একজন প্রতিনিধি মনোনীত করবেন।
- এই প্রতিনিধি হতে পারেন পরিবারের কোনো সদস্য, আত্মীয় বা বিশ্বস্ত কোনো ব্যক্তি।
গঠন প্রক্রিয়া: চেয়ারম্যান উভয় পক্ষকে নোটিশ দিয়ে তাদের প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। উভয় পক্ষ প্রতিনিধি দিলে চেয়ারম্যানসহ মোট ৩ সদস্যের একটি সালিস পরিষদ গঠিত হবে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ: সালিস পরিষদ উভয় পক্ষের কথা শুনবে এবং দ্বিতীয় বিয়ের কারণগুলো (যেমন: স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা শারীরিক অক্ষমতা) যাচাই করবে। পরিষদ যদি মনে করে প্রস্তাবিত বিয়েটি ন্যায়সংগত, তবেই তারা লিখিত অনুমতি দেবে।
আরও পড়ুন:





