Recent event

আমেরিকায় তুষারঝড় ‘ব্লিজার্ড ২৬’: ১০ হাজার ফ্লাইট বাতিল, ৪ কোটি মানুষ গৃহবন্দি

আমেরিকায় তুষারঝড়
আমেরিকায় তুষারঝড় | ছবি: বিবিসি
0

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আঘাত হেনেছে এক প্রলয়ঙ্কারি শক্তিশালী শীতকালীন তুষারঝড়, যা এরইমধ্যে ‘ব্লিজার্ড ২৬’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। গত ১০ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম এই তুষারঝড়ে নিউ ইয়র্ক সিটি, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া এবং ম্যাসাচুসেটসসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কয়েক ফুট তুষারের নিচে। স্থানীয় সময় গতকাল (রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুর থেকে শুরু হওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। চার কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে ব্লিজার্ড সতর্কতার অধীনে রয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্কে আজ (সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল পর্যন্ত প্রায় ১৫.১ ইঞ্চি তুষারপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে লং আইল্যান্ড এবং নিউ জার্সির পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে কোথাও কোথাও তুষারের স্তর ২৬ ইঞ্চি বা ২ ফুট ছাড়িয়ে গেছে। ঝড়ের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, আবহাওয়া অফিস এটিকে ‘বোম্ব সাইক্লোন’ বা শক্তিশালী সাইক্লোনের সঙ্গে তুলনা করছে। তীব্র তুষারপাতের পাশাপাশি ঘণ্টায় ৫০ থেকে ৭৫ মাইল বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস উপকূলীয় অঞ্চলে হারিকেনের সমতুল্য পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তুষারঝড়ের কারণে নিউ ইয়র্ক সিটি, নিউ জার্সি, রোড আইল্যান্ড এবং কানেকটিকাটসহ সাতটি অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার দুপুর পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক সিটি এবং নিউ জার্সিতে সব ধরনের ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। শুধু জরুরি সেবার গাড়ি ছাড়া অন্য সব গাড়ি রাস্তায় নামানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং নিউ জার্সির গভর্নর পরিস্থিতিকে ‘জীবনহানিকর’ হিসেবে বর্ণনা করে বাসিন্দাদের ঘরের বাইরে বের না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ঝড়ের প্রভাবে আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন ধস নেমেছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ১৯ হাজার ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ১০ হাজারের বেশি ফ্লাইট পুরোপুরি বাতিল করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি, লাগার্ডিয়া এবং নেওয়ার্ক বিমানবন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইতিমধ্যে ১৩টি আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছে।

আরও পড়ুন:

বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে। ভারি তুষার এবং তীব্র বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সবশেষ খবর অনুযায়ী, ম্যাসাচুসেটস, নিউ জার্সি এবং কানেকটিকাটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ছয় লাখের বেশি গ্রাহক বর্তমানে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় অন্ধকারে রয়েছেন। তীব্র ঠান্ডার মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে নিউ ইয়র্কের রকওয়েজ এলাকায় হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ায় নগর কর্তৃপক্ষ সেখানে জরুরি ‘ওয়ার্মিং সেন্টার’ বা উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। নিউ ইয়র্ক সিটি এবং বোস্টনের সব সরকারি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আবহাওয়া এতটাই প্রতিকূল যে, শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাসের সুবিধাও রাখা সম্ভব হয়নি। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির মতো বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের সব কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

আরও পড়ুন:

এদিকে, আমেরিকার এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও। নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন, কুইন্স এবং ব্রঙ্কসের মতো বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলো এখন তুষারে ঢাকা। ট্রেন ও ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় কর্মস্থলে যেতে পারছেন না অনেকেই। প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, বাসার সামনে কয়েক ফুট তুষার জমে থাকায় তারা কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন।

নিউ ইয়র্ক সিটির স্যানিটেশন বিভাগ প্রায় ২৩০০ তুষার সরানোর গাড়ি (স্নোপ্লাউ) দিয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে চার ইঞ্চি হারে তুষারপাত হতে থাকায় পরিষ্কার করা রাস্তাগুলো আবারও দ্রুত তুষারে ঢেকে যাচ্ছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সোমবার বিকেলের পর তুষারপাত কিছুটা কমলেও মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত তীব্র বাতাস ও হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বজায় থাকবে। বুধবার থেকে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লে তুষার গলতে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে আবহাওয়াবিদরা সপ্তাহের শেষে আবারও একটি হালকা তুষারপাতের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছেন, যা উদ্ধার তৎপরতায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।

এসএস